চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণা করা হয় ২০০৩ সালে। ওই বছরের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকার ১৬টি সুপারিশসহ বাণিজ্যিক রাজধানী সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভায়। পরবর্তীতে ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী করার লক্ষ্যে অনুুমোদিত সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিও দেয়া হয়। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। দীর্ঘ এ সময়ে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে উঠেনি চট্টগ্রাম।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির ঘোষিত ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার বিষয়টি। ইশতেহারে আছে এই অঞ্চলকে ‘কর্মসংস্থানের হাব’ করারও প্রতিশ্রুতিও। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি নগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানীতে পরিণত করার দাবি জানান দলটির চট্টগ্রামের নেতারা। তাদের এ দাবি ও অনুরোধ আমলে নিয়ে ইশতেহারে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তরে প্রতিশ্রুতি দেয়ায় উচ্ছ্বাস ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তারা।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনায় জানা গেছে, ক্ষমতায় গেলে অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। অর্থাৎ দেশের যে অঞ্চলে যেই অর্থনৈতিক ও শিল্প উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত বিএনপি সে অঞ্চলে সেই উপযুক্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নে অগ্রাধিকার দিবে। মূলত এর অংশ হিসেবেই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার বিষয়ে ইশতেহারে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলকে কর্মসংস্থানের হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে’।
জানা গেছে, পলোগ্রাউন্ডের জনসভায় বিএনপি ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী করার জন্য তারেক রহমানের কাছে নিজেদের বক্তব্যে অনুরোধ জানান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম–৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম–৯ আসনের বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম–১০ (হালিশহর–পাহাড়তলী) আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান। এছাড়া ওই সভায় চট্টগ্রাম–১১ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্যিক রাজধানীর পাশাপাশি এখানকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামকে অর্থনীতির হাব হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। একইসভায় তারেক রহমানও ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রতিশ্রুতি দেন।
চট্টগ্রাম ঘিরে আরো যে প্রতিশ্রুতি : বিএনপির ইশতেহারে বাণিজ্যিক রাজধানীর পাশাপাশি আরো কিছু পকিল্পনাও তুলে ধরা হয় চট্টগ্রামকে ঘিরে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক ও যাত্রী হাবে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া তিন পার্বত্য জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন’ গড়ে তোলার পাশাপাশি ওই তিন জেলার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে জেলা হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়ন করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়, নদী পথকে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ‘ওয়াটার হাইয়ে’ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের মত কেন্দ্রে আধুনিক রিভার পোর্ট ও ইন্টারমোডাল টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। বন্দর আধুনিকীকরণ ও বাণিজ্য হজীকরণ করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চট্টগ্রামকে আরও শক্তিশালী করে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ দেওয়া হবে। চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামকে ‘অর্থনীতির হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এই হাব শুধু বাংলাদেশের জন্য হবে না। এটা আমাদের পাশে যে দেশগুলো আছে, আমাদের পূর্ব–পশ্চিমে সকলের জন্য আগামীদিনে চট্টগ্রামকে অর্থনীতির হাবে আমরা পরিণত করব।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রামবাসী এবং চট্টগ্রামের যারা ব্যবসায়ী আছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে চাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হোক। যাতে ব্যবসা–বাণিজ্য আরো প্রসারিত হয় এবং চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়। বিএনপির ইশতেহারে বিষয়টি এসেছে, সেজন্য চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মেয়র বলেন, সত্যিকার অর্থে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করতে হলে এখানে নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সিটি গভর্মেন্ট বাণিজ্যিক রাজধানীর পূর্বশর্ত। আমরা যদি একটি পরিকল্পিত শহর গড়তে চাই, সেক্ষেত্রে নগর সরকারের কোনো বিকল্প নেই। বাণিজ্যিক রাজধানীর সমস্ত প্লানগুলো সাজিয়ে ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া উদ্যোগ নেন এবং বীমা ও ব্যাংক–এর হেড অফিস এখানে আসে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ও এখানে। সুতরাং সে লক্ষ্য থেকেই বাস্তবিক অর্থেই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপ দিতে হবে। এ বিষয়ে ২৫ জানুয়ারির সভায় তারেক রহমান অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। সেই অঙ্গীকার কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে কাজে প্রতিফলিত করার লক্ষ্যে তিনি ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, ২৫ জানুয়ারির জনসভায় ডা. শাহাদাত বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়তে পদক্ষেপ নেয়া হবে, চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে বিশ্ববাণিজ্যের হাব এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
এদিকে ২৫ জানুয়ারি জনসভায় তারেক রহমানের কাছে চট্টগ্রামকে সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রস্তাব দেয়া সাইদ আল নোমান আজাদীকে বলেন, বাণিজ্যিক রাজধানীর ১৬ দফা আমার বাবা নিজের হাতে ড্রাফট করে ২০০৩ সালের কেবিনেটে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে পেশ করেছিলেন। সেটা ক্যাবিনেটে অনুমোদনও হয়। সে হিসেবে ২০০৩ সালেই বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষিত হয়। কিন্তু এটার বাস্তবায়নে যে কাজগুলো দরকার সেটা পরবর্তী সরকার সেটা করেনি। সেজন্য পলোগ্রাউন্ড মাঠে বলেছিলাম, বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের নেতা তারেক রহমানও বলেছেন, দল ক্ষমতায় গেলে চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করা হবে। এখন সেটা যে নির্বাচনী ইশতেহারে এসেছে সেটা গর্বের বিষয়। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হলে আমাদের অনেক সমস্যা অটোমেটিক সমাধান হয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, ২৫ জানুয়ারির নির্বাচনী সভায় তারেক রহমান বলেছেন, এই অঞ্চলের মানুষের একটি বড় দাবি আছে। যেই দাবিটির ব্যাপারে বিগত বিএনপি সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ করে যেতে পারেনি। দেশনেন্ত্রী খালেদা জিয়া উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সময়ের অভাবে সম্পূর্ণ করে যেতে পারেনি। আমরা দেখেছি বিগত ১৫ বছরে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ কেউ গ্রহণ করেনি। এই উদ্যোগ যদি গ্রহণ করা হয়, তাহলে শুধু এই চট্টগ্রামের মানুষ নয়, সমগ্র চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সারা দেশে ব্যবসা–বাণিজ্য অনেক চাঙা হবে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে। মানুষ চাকরি ও ব্যবসা–বাণিজ্য করে খেতে পারবে। কী সেটি? বাণিজ্যিক রাজধানী। ইনশাআল্লাহ। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে আপনাদের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে খালেদা জিয়ার সেই উদ্যোগ যত দ্রুত সম্ভব, আগামী বিএনপি সরকার সেটিকে বাস্তবায়ন করবে। যাতে এই এলাকার মানুষ ব্যাংকিং সুবিধাসহ সকল কিছু এখানে বসেই কাজ সেরে নিতে পারে।
প্রদা/ডিও





