ক্ষমতাচ্যুত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক অস্থিরতা কাটাতে উন্নয়ন প্রকল্প কাটছাঁট করে বাহবা নিলেও নিয়মিত বা পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
মেয়াদের শেষ সময়ে এসে বেতন বৃদ্ধি, ভাতা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর মতো যেসব জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দায়িত্ব নিতে যাওয়া নতুন সরকারের জন্য এক বিশাল রাজস্ব সংকট তৈরি করবে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে, একদিকে রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত দুর্বল, অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দীর্ঘদিনের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা আরও গভীর হচ্ছে। এর ফলে নতুন সরকারকে এমন সব রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংবেদনশীল অঙ্গীকারের চাপ নিতে হবে, যার অর্থায়নের সক্ষমতা বর্তমানে রাষ্ট্রের হাতে নেই।
সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা তৈরি করছে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব। কেবল মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যা সশস্ত্র বাহিনী বা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করলে আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। যদিও বর্তমান প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছে।
তবে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখলেও চাপ কমে না। পর্যাপ্ত রাজস্ব না বাড়িয়ে কেবল ঋণ নিয়ে বা টাকা ছাপিয়ে এই ব্যয় মেটানো হলে দেশে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে। বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশের ঘরে আটকে আছে, যা দিয়ে সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোই দায়।
বেতন-ভাতার পাশাপাশি বাজেট পেশের মাস পাঁচেক আগেই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে নতুন পরিবার যুক্ত করা এবং মৎস্য খাতের জন্য বিদ্যুৎ বিলে ছাড়ের মতো সিদ্ধান্তগুলো আগামী বাজেটে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এই উদ্যোগকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্বাচিত সরকার বাজেটের সময় নেয়, অথচ অন্তর্বর্তী সরকার আগাম ঘোষণা দিয়ে পরবর্তী সরকারের জন্য অদৃশ্য চাপ তৈরি করেছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের দায়ও শেষ পর্যন্ত নতুন প্রশাসনের কাঁধেই পড়বে।
অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয়ের এই উল্লম্ফন উন্নয়ন খাতের টুঁটি চেপে ধরেছে। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে এসেছে, যা দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা।
পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও স্বীকার করেছেন যে, জিডিপির ৭-৮ শতাংশ রাজস্ব নিয়ে কোনো উন্নয়ন কৌশলই সফল করা সম্ভব নয়। দুর্নীতি কমানোর যুক্তিতে বেতন বাড়ানোর যে সুপারিশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে টিআইবি প্রধান ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, শক্তিশালী জবাবদিহি ছাড়া কেবল বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়, যার প্রমাণ ২০১৫ সালের বেতন বৃদ্ধির পর দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, কাঠামোগত রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এই বিশাল ব্যয়ের বোঝা সামলানো নতুন সরকারের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
প্রদা/ডিও







