আদানি পাওয়ারের সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও নজিরবিহীন দুর্নীতির তথ্য পেয়েছে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি। এই বিতর্কিত ও অসম চুক্তি বাতিলের লক্ষ্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। একই সঙ্গে এই চুক্তির নেপথ্যে সাত-আটজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলার অবৈধ সুবিধা নেওয়ার তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
রোববার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটি। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানির সঙ্গে করা চুক্তিতে এমন সব গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিরল। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই চুক্তি নিয়ে দ্রুত সিঙ্গাপুরে সালিশি মামলা করতে হবে। আইনি ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করলে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চুক্তির সঙ্গে জড়িত সাত-আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দেওয়া হয়েছে এবং সংস্থাটি ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনো ব্যক্তিগত হিসাবে লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।
কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আদানির বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে চরম বৈষম্য করা হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ গ্রিড থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের দাম যেখানে ছিল ৪.৮ সেন্ট, সেখানে আদানির দাম ধরা হয় ৬.৮ সেন্ট। এমনকি ২০২৫ সাল নাগাদ এই দাম ১৪.৮৭ সেন্টে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছে। অন্যান্য উৎসের তুলনায় আদানির বিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
চুক্তির শর্তগুলোকেও একপাক্ষিক ও দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে আদানির কোনো ব্যবসায়িক ক্ষতি হলে তার দায়ভারও বাংলাদেশ সরকারকে বহন করতে হবে। এছাড়া সব পাওনা ডলারে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং মাসিক ১.২৫ শতাংশ চড়া সুদের হার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, আদানি পাওয়ার এক বার্তায় দাবি করেছে, পর্যালোচনা কমিটির এই প্রতিবেদনের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। এমনকি কোনো তথ্য বা মতামতও তাদের কাছ থেকে চাওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা সত্ত্বেও তারা বাংলাদেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, তবে বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
প্রদা/ডিও







