আসন্ন ২০২৬ পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নজিরবিহীন এক সংকটের মুখে পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে কেন্দ্র করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ এখন কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায়, যা বিশ্বকাপ আয়োজনকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গত ডিসেম্বরের আইপিএল নিলামে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। তবে নিলামের কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) নির্দেশে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না আসায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
বাংলাদেশে অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক ও আদর্শিক চাপের মুখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন ক্রীড়াক্ষেত্রেও স্পষ্ট।
যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিষয়টিকে কেবল নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং ‘জাতীয় মর্যাদার বিষয়’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের খেলা নিরাপদ নয়।
২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে আবেদন করেছে যেন তাদের গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে অন্য ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়।
আইসিসি তাদের প্রাথমিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে ভারতের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি নেই বলে উল্লেখ করলেও বাংলাদেশ সেই প্রতিবেদন চূড়ান্ত হিসেবে মানতে নারাজ। সাম্প্রতিক এক ভিডিও কনফারেন্সে বিসিবিকে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও বোর্ড তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
এদিকে আইসিসির নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান জয় শাহের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছে।
ভারতের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। দেশটির খ্যাতিমান ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ পুরো ঘটনাকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করেছেন। সিনিয়র সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাই প্রশ্ন তুলেছেন—ক্রিকেট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কি এখন ক্রীড়া প্রশাসনের বাইরে অন্য কোথাও থেকে আসছে?
একই সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার কথাও আলোচনায় এসেছে। মোস্তাফিজ ইস্যুতে কেকেআরের মালিক শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে উগ্র গোষ্ঠীর বিক্ষোভ, আইপিএল বয়কটের ডাক—সব মিলিয়ে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভেন্যু সংকটের সমাধান না হয়, তবে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়েই পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তাতে যেমন বাংলাদেশের বড় আর্থিক ক্ষতি হবে, তেমনি আইসিসির জন্যও টুর্নামেন্ট আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে।
তবে সমাধানের পথও রয়েছে। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের সময় যেভাবে ‘হাইব্রিড মডেল’ অনুসরণ করা হয়েছিল, একই পদ্ধতিতে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দিচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান।
২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপে ২০টি দল অংশ নেওয়ার কথা। তবে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের এই টানাপোড়েন বিশ্বকাপের সূচি ও সাফল্য—দুটোকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
প্রদা/ডিও






