তারেক রহমানের পরিকল্পনা
তিনি বলেছেন, আমাদের যেকোনো মূল্যে হোক ডেমোক্রেটিক প্রসেসটা চালু রাখতে হবে, আমাদের জবাবদিহিতাটা চালু রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। সেটি জাতীয় পর্যায়ে হোক সেটি লোকাল পর্যায়ে হোক অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হোক, পৌরসভা নির্বাচন, লোকাল পর্যায়ে নির্বাচন হোক, সেটা কোনো ট্রেড বডির ইলেকশন হোক। আমার বিশ্বাস, আমরা যেকোনো মূল্যে যদি এই জবাবদিহিতাটা, গণতান্ত্রিক প্রসেসটা যদি আমরা কন্টিনিউ করতে পারি, অনেক বেগ হয়ত আসবে, অনেক কঠিন হবে, কিন্তু একটা সার্টেন টাইম পরে নিশ্চয়ই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারব।
আসুন দেশের মানুষের জন্য কাজ করি
তারেক রহমান বলেন, কাউকে আঘাত না করে বলতে চাইছি, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-সদস্য কাউকে আমি আঘাত করতে চাইছি … আমি আমার চিন্তাটা শুধু ওনাদের সামনে তুলে ধরতে চাইছি যে আসুন আমরা দেশের মানুষের শিক্ষা, দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, দেশের নারীদের অধিকার, এমপাওয়ারমেন্ট, কর্মসংস্থান পরিবেশ… সবকিছু মিলিয়ে এই যে বিষয়গুলো যেটি একটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রযোজ্য, আমরা অনেকদিন ধরে রিফর্মের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এই রিফর্মের মধ্যে আমার কাছে মনে হয়েছে যে তিনটি পার্ট আছে। একটি হচ্ছে সাংবিধানিক পার্ট, একটি আইনগত পার্ট এবং আরেকটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা, তাদের সিকিউরিটি সবকিছু নিয়ে একটি পার্ট আছে।
আমরা সাংবিধানিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, আইনগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমার মনে হয়েছে, মানুষের প্রতিদিনকার প্রত্যেকটি মানুষ সব সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের প্রতিদিনকার যেই চাওয়া-পাওয়াগুলো, প্রয়োজনগুলো সেটা নিয়ে বোধহয় আমরা আলাপ আলোচনা একটু কম করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, সেই বিষয়গুলো নিয়ে বোধহয় আলোচনা করা উচিত, সেই বিষয়গুলো নিয়ে বোধহয় প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের আলোচনা করা উচিত। আমরা শুধু রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সেমিনার করছি, সিম্পোজিয়াম করছি আলোচনা করছি, তর্ক বিতর্ক করছি। অবশ্যই ওগুলো প্রয়োজন আছে কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের প্রতিদিনকার চিকিৎসা ব্যবস্থা কী হবে, কর্মসংস্থান কী হবে, সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থা কী হবে, রাস্তায় বের হলে নিরাপদে সে ফিরে আসতে পারবে কি না…. এই বিষয়গুলো নিয়ে বোধহয় আমাদের আলোচনা আরেকটু বেশি হওয়া উচিত, এই বিষয়গুলো নিয়ে বোধহয় আমাদের প্ল্যান প্রোগ্রাম আরেকটু বেশি হওয়া উচিত।
নতুন প্রজন্ম দিক নির্দেশনা চায়
তারেক রহমান বলেন, আমার দেশে ফিরে আসার পরে আমি যে কয়বার আমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে… আমি সাভারে গিয়েছিলাম আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম, আমার মনে হয়েছে, নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, একটি আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম না, প্রতিটি প্রজন্মই মনে হয় কিছু একটি গাইডেন্স চাইছে।
আমরা যারা রাজনীতিবিদ আমাদের কাছে হয়ত অনেক প্রত্যাশা। সব প্রত্যাশা হয়ত পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এই সবগুলোকে আমাদের সামনে রেখে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা জাতিকে একটি সঠিক ডাইরেকশনে নিয়ে যেতে সক্ষম হব।
যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একটি ছোট ঘটনা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরতে চাই। আমাকে চিকিৎসার জন্য এ দেশ থেকে ২০০৮ সালে চলে যেতে হয়েছিল যুক্তরাজ্যে। ২০০৮ সালে যাবার পরে ২০১০ সালে সেখানে প্রথম একটি নির্বাচন আমি দেখেছিলাম। যেহেতু সেটি নির্বাচন ছিল স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার একটি ইন্টারেস্ট ছিল…. টিভির সামনে বসে আমি ডিবেট দেখছিলাম। সেখানে দুটি মেইন দলের নেতার মধ্যে লেবার এবং কনজারভেটিভ দলের মধ্যে এই ডিবেট। অনেকদিন ধরে লেবার ছিল, ২০১০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ আসে, তো দুই দলের দুই নেতার মধ্যে একটি আলোচনা হচ্ছিল।
খুব দুঃখজনক হলো বাংলাদেশ বাদই দিলাম শুধু ঢাকা শহরের মধ্যেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নেই। গত ৫৪/৫৫ বছরে আমরা মানুষের চিকিৎসা সেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস গড়ে তুলতে সক্ষম হইনি… এটি খুব দুঃখজনক ব্যাপার। এই অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নিয়ে ওই দুই নেতার মধ্যে তখন কথা হচ্ছিল। যতটুকু আমার মনে আছে তখন ইমার্জেন্সির জন্য অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস কল করলে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগত অ্যাম্বুলেন্স আসতে। একজন বলছে ২০ মিনিট লাগে… এটাকে আমরা ১৯ মিনিটে নিয়ে আসব। আরেকজন বলছিল ২০ মিনিট লাগে এটাকে আমরা ১৫ মিনিটে নিয়ে আসব। অর্থাৎ একজন এক মিনিট কমাচ্ছে একজন পাঁচ মিনিট কমাচ্ছে। এই কাজটি তারা তাদের জনগণের জন্যই করতে চাইছে।
পানি সমস্যা
তারেক বলেন, পানির সমস্যা…এখন যেভাবে চলছে এভাবে যদি চলে, আমার ধারণা, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর হার্ডলি ২০ বছর পরে ঢাকা শহরে কোনো জায়গা থেকে পানি পাব না। বুড়িগঙ্গা নদী ১০০% পলিউটেড। শীতলক্ষ্যা নদী ৫০% এর মতো পলিউটেড। এখন মেঘনা নদী থেকে পানি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, কয়েকটা প্রজেক্ট কাজ হচ্ছে। কিন্তু এটার পানিও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে পলিউটেড হয়ে যাবে।
ঢাকা শহরে যে সাড়ে তিন কোটির মতন মানুষ বাস করছে… এরা পানি পাবে না। পানির অপর নাম জীবন। সারাদেশে যদি এই সমস্যা শুরু হয়, তাহলে বিষয়টি কত ভয়াবহ হতে পারে, আমার মনে হয়, এই রকম বিষয়গুলো নিয়ে এখন আলোচনা হওয়া উচিত। সেটি সংসদে হোক আর সেমিনারে হোক। কারণ তা না হলে একটি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে, হয়তবা হুইচ ইজ ভেরি আনওয়ান্টেড।
কর্মসংস্থান
তিনি বলেন, আমাদের ২০ কোটির মতো মানুষ এই দেশে এবং যাদের মধ্যে একটি বড় অংশ তরুণ। ভাবতে হবে কীভাবে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় … সেটি দেশে হোক বা দেশের বাইরে।
এটি করতে না পারলে ৫ আগস্ট বলি, ৯০ এর আন্দোলন বলি, একাত্তর বলি, মনে হয়, হয়ত প্রতিটি প্রত্যাশা ধ্বংস হয়ে যাবে।
নারী-পুরষের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাংলাদেশে গত বছরে সাত হাজারের মতো মানুষ রোড অ্যাক্সিডেন্টসে মারা গেছে। আমার কাছে বিষয়টি খুব অস্বাভাবিক লাগে। আমার ধারণা, আপনারা যদি একটু চিন্তা করেন, আপনাদের প্রত্যেকের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক লাগবে, কিন্তু ঘটনাটি ঘটছে…. কোনো বছর বেশি কোনো বছর কম। এই অস্বাভাবিক ঘটনাটি কেন ঘটবে?
রোড অ্যাক্সিডেন্টে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগের সামাজিক স্ট্যাটাসটা যদি দেখি, খুব অবস্থাপন্ন লোক, যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল তারা যে মারা যাচ্ছে তা না। কিন্তু যে মানুষগুলো মারা যাচ্ছে, তারা হয়ত তাদের ফ্যামিলির অনলি আর্নিং সোর্স। তাদের মৃত্যুর পর তাদের ফ্যামিলির কী হচ্ছে অথবা লোকটি যদি পঙ্গু হয়ে যায়, তাহলে তার ফ্যামিলির ওপরে কী হচ্ছে- এই বিষয়টি বোধহয় আমাদের নজরে আনা উচিত। এমন অনেক বিষয় আছে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবা উচিত।
কৃষকদের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষকদের বিভিন্ন অসহায়ত্বের নিউজ আপনাদের সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। আমার দলের বিগত সরকারের কথা বলব, সেই সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
এত বিশাল সংখ্যাক কৃষক, যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করছে, অন্নের সংস্থান করছে, তাদের কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়? তাদের হয়ত সেভাবে বলার সুযোগ নেই। এখানে আপনারা সংবাদপত্রের কর্মীরা, আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন, আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শুনতে জানতে সহজ হয়, কারণ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি। কিন্তু ওই কৃষকগুলো, যাদের কোনো ভেন্যু নেই, যারা এমন একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছে না, তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো? কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।
দুর্নীতি কমানো
তারেক রহমান বলেন, করাপশনটা যাতে স্প্রেড না করে, করাপশনটা যাতে একটা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে। কিছু তো অ্যানোমালিজ (অস্বাভাবিকতা) হতে পারে, সেটি আমরা গ্রাজুয়ালি ঠিক করব।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ
তারেক রহমান বলেন, আরেকটি ভয়াবহ পরিস্থিতি হচ্ছে যে আমাদের জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এত মানুষের সমস্যা সমাধান করতে পারব না।
সেজন্য আমাদের অবশ্যই পপুলেশন কন্ট্রোলে যেতে হবে। আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে সীমাবদ্ধতার মধ্যে আনতে হবে এবং সেজন্য আমাদের টার্গেট হেলথ কেয়ারে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ…. এক লাখের মতো লোক নিয়োগ করা। এই হেলথ কেয়ারের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমরা নারী কর্মীদের নিয়োগ দিতে চাই, যাতে নারী কর্মীরা গিয়ে ঘরে ঘরে বোঝাতে সক্ষম হন যে কী জন্য প্রয়োজন হাইজিন মেইনটেইন করা এবং পরিবারকে সুস্থ রাখা, একই সঙ্গে পরিবারের সদস্য সংখ্যা একটি রিজনেবল সংখ্যার মধ্যে রাখা।
কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, সবার জন্য চিকিৎসা সুবিধা, তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য ভোকেশনাল-টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউশন আধুনিকায়ন এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, আইটি সেক্টার, উদ্যোক্তা তৈরি করা, আইটি পার্কগুলোকে নতুনভাবে সুবিধা দিয়ে গড়ে তোলা, কন্টেট তৈরির কাজে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে আরও সহজ করা এসবও রয়েছে তারেক রহমানের পরিকল্পনায়।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
প্রদা/ডিও






