ব্যবসায়ীদের মতে, গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ২ শতাংশে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নিলেও মূল সমস্যা এখন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়া।
প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ঝুড়ির চেয়ে নেতিবাচক ঝুড়ি বেশি ভারী। একদিকে অর্থনীতির সংগ্রাম চলছে, অন্যদিকে জীবিকার সংগ্রামও চলছে। তবে এর চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ হতে পারত। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট, কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত।’
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত নিশ্চয়তার অভাব। ব্যাংকঋণের সুদ এখন ১৪-১৬ শতাংশের ঘরে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘গলার কাঁটা’। ডলারের দাম ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় স্থির হলেও বাজারে ডলারের অপ্রতুলতা কাটেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক এলাকায় নতুন নামে চাঁদাবাজি ও শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পাঞ্চলগুলোকে অস্থির করে তুলেছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রিতে বড় ধস নেমেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কারখানার উৎপাদন লাইনে। একদিকে অবিক্রীত পণ্যের মজুদ বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে কারখানাগুলো তাদের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক শিল্পোদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে কারখানার শিফট কমিয়ে দিয়েছেন, এমনকি উৎপাদন খরচ পোষাতে না পেরে কোনো কোনো ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক শিল্প খাতের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রধান রসদ যে ব্যাংকঋণ, সেটিই এখন উদ্যোক্তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক বছরে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে গিয়ে ঠেকায় নতুন বিনিয়োগের পথ যেমন রুদ্ধ হয়েছে, তেমনি চলতি মূলধনের জোগান দিতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। উচ্চ সুদের কারণে একদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বহুগুণ বেড়েছে, অন্যদিকে তারল্যসংকটের অজুহাতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে।
বড় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁরা সময়মতো ঋণের কিস্তির বাধ্যবাধকতা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রায় ৭৮ লাখ সিএমএসএমই মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখছে। মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশ এসব শিল্পে জড়িত। তাদের বড় অংশই এখন সংকটে আছে বলে জানা গেছে।
বিনিয়োগের প্রধান নির্দেশক মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ২০২৫ সালে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে বেসরকারি ঋণের যে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৬.২৩ শতাংশ, তা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, ‘২০২৫ সালজুড়েই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির চাপ, জ্বালানি সরবরাহ, নিরাপত্তাহীনতা, সুদের হার ও ঋণপ্রবাহের ধীরগতি বেসরকারি খাতের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোট চাহিদা কমিয়ে এনেছে এবং বিনিয়োগও কমে আসছে। নতুন বছরে আমরা আশা করব, নতুন সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।’
ট্রাম্পশুল্কে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমায় কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে রপ্তানিকারকদের। টানা চার মাস ধরে পণ্য রপ্তানি কমায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস রপ্তানি খাতেও স্বস্তি নেই। নভেম্বর মাসে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৯ কোটি ডলারের পণ্য। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৫৪ শতাংশ কম।
প্রদা/ডিও





