ইউক্রেন সংকট সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এটি কিয়েভের জন্য তার ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব নয়’। খবর বিবিসি’র।
শনিবার ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ, কানাডা ও জাপানের নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, পরিকল্পনায় ‘দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায্য শান্তির’ জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকলেও সীমানা পরিবর্তন এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধতার প্রস্তাব উদ্বেগজনক। তারা জানান, পরিকল্পনাটি নিয়ে ‘আরও কাজ করতে হবে’।
রোববার জেনেভায় ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এ নিয়ে বৈঠকে বসবেন। আলোচনায় অংশ নেবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েল।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, মস্কোর পক্ষে অনুকূল মনে হওয়া এই পরিকল্পনা মানতে যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে, আর এর ফলে ইউক্রেন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটির’ মুখোমুখি হয়েছে। ট্রাম্প ইউক্রেনকে ২৭ নভেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার সময়সীমা দিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এই পরিকল্পনাটি সমাধানের একটি ‘ভিত্তি’ হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত জি–২০ শীর্ষ সম্মেলনে কানাডা, ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও নরওয়ের নেতারা পরিকল্পনা নিয়ে তাদের যৌথ অবস্থান তুলে ধরেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জোর করে সীমানা পরিবর্তন করা যাবে না এবং ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর প্রস্তাবিত সীমাবদ্ধতা দেশটিকে ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। এছাড়া পরিকল্পনার ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটো–সংশ্লিষ্ট অংশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট জোটগুলোর সদস্যদের সম্মতি জরুরি হবে।
জি–২০ সম্মেলনের সুযোগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার জেলেনস্কি এবং ট্রাম্প—দুজনের সঙ্গেই ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতার প্রস্তাব ‘মৌলিকভাবে উদ্বেগজনক’, কারণ যুদ্ধবিরতি হলেও ইউক্রেনকে আত্মরক্ষার সক্ষম থাকতে হবে।
ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনায় প্রস্তাব করা হয়েছে— পূর্ব দোনেৎস্কের অবশিষ্ট অংশ থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রত্যাহার; দোনেৎস্ক, লুহানস্ক ও ক্রাইমিয়ার ওপর রাশিয়ার কার্যত নিয়ন্ত্রণ স্বীকার; দক্ষিণাঞ্চলের খেরসন ও জাপোরিঝিয়ার সীমানা বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্র বরাবর নির্ধারণ; ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছয় লাখে সীমিত রাখা; যুদ্ধবিমান প্রতিবেশী পোল্যান্ডে মোতায়েন রাখা।
এছাড়া কিয়েভকে ‘বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ঠিক কীভাবে তা দেওয়া হবে—তা স্পষ্ট নয়। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাকে আবার বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর গ্রুপ জি–৭–এ যুক্ত করে জি–৮ বানানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলো পছন্দ করতে হবে’, নইলে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
এর আগে একই দিনে জেলেনস্কি জাতিকে সতর্ক করে বলেন, দেশটি ‘একটি কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে পারে: নিজের মর্যাদা হারানো বা গুরুত্বপূর্ণ এক অংশীদারকে হারানোর ঝুঁকি নেওয়া’।
জেলেনস্কি আরও বলেন, ‘আজ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর একটি’, এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তিনি ‘গঠনমূলকভাবে’ কাজ করবেন।
শনিবার জেলেনস্কি ঘোষণা করেন, তার প্রধান কার্যালয়ের প্রধান অ্যান্ড্রি ইয়েরমাক ইউক্রেনের আলোচনায় নেতৃত্ব দেবেন। এসব আলোচনায় ভবিষ্যতে শান্তি চুক্তি হতে পারে, এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে হওয়া আলোচনাতেও।
প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধি জানেন কীভাবে ইউক্রেনের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হয় এবং রাশিয়াকে তৃতীয় আক্রমণ বা আরও কোনো হামলা থেকে রক্ষা করতে ঠিক কী করতে হবে।’
কিয়েভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উন্নত অস্ত্র সরবরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা রাশিয়ার মারাত্মক আকাশ হামলা রোধ করতে সাহায্য করে, এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত গোয়েন্দা তথ্য।
শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিশ্চিত করেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা পেয়েছে; তবে এটি ক্রেমলিনের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে আলোচনায় আনা হয়নি।
পুতিন বলেন, মস্কো ‘নমনীয়তা’ দেখাতে প্রস্তুত, তবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রস্তুত।
প্রদা/ডিও







