বিবিসি এখন তার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের মুখে পড়েছে। এক বছরের পুরোনো একটি তথ্যচিত্র সম্পাদনা–সংক্রান্ত ভুলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের এই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে কঠোরভাবে সমালোচনা করছে রক্ষণশীল রাজনীতিকরা, অন্যদিকে উদারপন্থীরা বলছেন—প্রতিষ্ঠানটিতে ত্রুটি থাকলেও এটি টিকিয়ে রাখা জরুরি।
এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে তৈরি এক বছর পুরোনো একটি তথ্যচিত্রে বিভ্রান্তিকর সম্পাদনার অভিযোগে তিনি বিবিসিকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। এতে তিনি অন্তত ১০০ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
তথ্যচিত্রটি ‘পূর্ণ ও ন্যায্যভাবে প্রত্যাহার’ করার জন্য বিবিসিকে ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আইনজীবীরা।
বিবিসির একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘আমরা চিঠিটি পর্যালোচনা করব এবং যথাসময়ে সরাসরি এর উত্তর দেব।’
যদিও ট্রাম্প এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন, তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং দ্য দেস মোইনস রেজিস্টারের বিরুদ্ধে তার মামলা চলমান রয়েছে।
বিবিসির অনুষ্ঠান ‘প্যানোরামা’তে ট্রাম্পের একটি বক্তৃতার দুটি ভিন্ন অংশকে এমনভাবে সম্পাদনা করে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে মনে হচ্ছিল তিনি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্যাপিটল হিলের দাঙ্গায় উসকানি দিচ্ছেন।
মূলত, ট্রাম্পের সেই দিনের ভাষণ আক্রমণাত্মক হলেও ‘লড়াই’ করার আহ্বান এবং ক্যাপিটলে গিয়ে ‘সাহসী সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের উৎসাহিত করার’ পরামর্শ—দুটি ভিন্ন অংশে বলা হয়েছিল। তথ্যচিত্রটিতে এই দুটি অংশ জুড়ে দিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তিনি সহিংসতার জন্য সরাসরি ডাক দিচ্ছেন।
বিবিসির চেয়ারম্যান সমীর শাহ সোমবার এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন, ‘ভাষণটি যেভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল, তা সরাসরি সহিংস পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে বলে ধারণা তৈরি করেছিল।’ এই ‘বিবেচনাহীন ভুলের’ জন্য তিনি দেরিতে হলেও ক্ষমা চেয়েছেন।
এই সম্পাদনা কেলেঙ্কারি নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমে তুমুল সমালোচনার মুখে রোববার বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং বিবিসি নিউজের প্রধান ডেবোরা টারনেস পদত্যাগ করেন।
যদিও এই বিভ্রান্তিকর সম্পাদনার পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে কোনো প্রমাণ মেলেনি। এমনকি ডেভি বা টারনেস বিষয়টি আগে থেকে জানতেন বলেও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
কিন্তু ট্রাম্পের একজন আইনজীবী সোমবার অভিযোগ করেছেন, বিবিসি ‘প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং প্রতারণামূলকভাবে তথ্যচিত্রটি সম্পাদনা করে’ প্রেসিডেন্টের মানহানি করেছে।
সিএনএনের হাতে আসা ওই চিঠিতে দাবি করা হয়, এই ঘটনায় ট্রাম্পের ‘ব্যাপক আর্থিক ও সুনামের ক্ষতি’ হয়েছে, যদিও তথ্যচিত্রটি প্রচারের সময় কেউ এই ভুলটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি।
গত সপ্তাহে ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ একটি ‘অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনের’ বরাত দিয়ে এই ভুল সম্পাদনার বিষয়টি প্রকাশ করলে তা নিয়ে ঝড় ওঠে।
এই ঘটনা বিবিসির অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান রাজনৈতিক লড়াইকে আরও উসকে দিয়েছে। রক্ষণশীলরা এই ভুলকে বিবিসিকে আক্রমণ করার নতুন সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস রবিবার লিখেছেন, ‘আমি আনন্দিত যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং বাকি বিশ্ব বিবিসিকে তার আসল রূপে দেখতে পাচ্ছে। ট্রান্সজেন্ডার মতাদর্শ থেকে শুরু করে অর্থনীতি ও গাজা পর্যন্ত সবকিছুতে সত্য বলতে ব্যর্থ হওয়ায় এদেশের রাজনীতি ও সরকারের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমের এখানেই ইতি টানা উচিত।’
যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই বিবিসির জন্য ব্রিটিশ পরিবারগুলোর দেওয়া লাইসেন্স ফির বিরোধিতা করে আসছেন। সরকার বর্তমানে বিবিসির রয়্যাল চার্টার পর্যালোচনা করছে, যা ২০২৭ সালের শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। এই সুযোগে বিবিসির সমালোচকরা পরিবর্তন আনার দাবি জানাচ্ছেন।
‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর প্রতিবেদনটি মাইকেল প্রেসকটের একটি দীর্ঘ স্মারকলিপি [মেমো] ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল, যাকে বিবিসির সম্পাদকীয় মান পর্যালোচনার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। প্রেসকট তার মেমোতে সংবাদ পরিবেশনের গুরুতর সমস্যা এবং নেতৃত্বের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ সম্পর্কে বিবিসি বোর্ডকে সতর্ক করেছিলেন। ট্রাম্পের তথ্যচিত্রটি ছিল তার প্রথম উদাহরণ।
বিবিসির চেয়ারম্যান সমীর শাহ সোমবার এর জবাবে বলেন, ‘যেখানে আমরা ভুল করেছি, সেখানে সংশোধন প্রকাশ করেছি; সম্পাদকীয় নির্দেশনা পরিবর্তন করেছি এবং যেখানে সমস্যা নেতৃত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে, সেখানে নেতৃত্বেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।’
তবে তিনি সবাইকে ‘প্রেক্ষাপট বিবেচনা করার’ আহ্বান জানিয়ে বিবিসির ‘হাজার হাজার ঘণ্টার অসাধারণ সাংবাদিকতার’ কথাও মনে করিয়ে দেন।
বিবিসির অভিজ্ঞ সাংবাদিক জন সিম্পসন রবিবার রাতে এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘বিবিসি একটি সমন্বিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণের শিকার হচ্ছে।’
অন্যদিকে, ফিনান্সিয়াল টাইমসের রাজনৈতিক ভাষ্যকার রবার্ট শ্রিমসলি বলেছেন, ‘বিবিসি গুরুতর ভুল করেছে, এটি যেমন সত্য, তেমনি ডানপন্থী গণমাধ্যম এটিকে ধ্বংস করার জন্য একটি সমন্বিত প্রচারণা চালাচ্ছে—এই বিষয়টিও সত্য।’
এই বিতর্কের ঝড়ের মাঝে বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জেমস ল্যান্ডেল সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘আমরা নিখুঁত নই; আমাদের সবসময় আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু এক অন্ধকার হতে থাকা পৃথিবীতে আমরা এখনো এক ঝলক আলোর রশ্মি।’
প্রদা/ডিও







