চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে। আগামী ১৮ নভেম্বরের নির্বাচনে সভাপতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিক দলের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা কয়েকজন ব্যক্তি এবার বিভিন্ন পদে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের পেছনে স্থানীয় বিএনপি ও শ্রমিক দলের কিছু নেতার সহযোগিতা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শ্রমিকদের একাংশের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইস্টার্ন রিফাইনারির শ্রমিক সংগঠনে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা কয়েকজন নেতা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন পরিচয়ে সংগঠনের নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করছেন। এ নিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বক্তব্য এবং সাংগঠনিক নথিপত্রের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেওয়ান মোহাম্মদ বিলাল হোসেন ও আবু মোহাম্মদ নোমান। বিলাল হোসেনের নির্বাচনী প্রতীক ছাতা এবং নোমানের প্রতীক চেয়ার।
বিলাল হোসেনের বিরুদ্ধে অতীতে শ্রমিক লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় স্টেনিফেনি কমপ্লেক্সের শ্রমিক লীগের সভাপতি হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের প্রশ্ন, অতীতের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিচয় স্পষ্ট না করেই কীভাবে তিনি আবার শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে আসতে চাইছেন?
অন্যদিকে সভাপতি পদপ্রার্থী আবু মোহাম্মদ নোমানের বিরুদ্ধে শ্রমিক লীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক থাকার অভিযোগ তুলেছেন প্রতিপক্ষ শ্রমিক নেতারা। তাঁদের দাবি, বর্তমানে শ্রমিক দলের পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও তাঁর অতীত সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু সভাপতি পদ নয়, সিবিএর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের কয়েকজনের বিরুদ্ধেও শ্রমিক লীগের সঙ্গে অতীত সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, কার্যকরী সভাপতি পদে নুরুল সালাম (সাইকেল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে শ্রমিক লীগের ছাত্র সম্পাদক থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া যুগ্ম সম্পাদক পদে মো. ইকরামুল হক (বই), সিনিয়র সহসভাপতি পদে প্রকাশ রায় (মাছ), আইনবিষয়ক সম্পাদক পদে মো. ওয়ালী উল্লাহ (দোয়াত-কলম), কার্যকরী সভাপতি পদে মো. নাঈমুল করিম (হারিকেন) এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে মো. আব্দুল্লাহ-আল-মারুফ (বাস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রার্থীর মধ্যে কয়েকজন অতীতে শ্রমিক লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশ রায় শ্রমিক লীগের সহসভাপতি, ওয়ালী উল্লাহ প্রচার সম্পাদক, নাঈমুল করিম সাধারণ সম্পাদক এবং আব্দুল্লাহ-আল-মারুফ কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে আরেকটি বড় অভিযোগ উঠেছে ভোটার তালিকা ও শ্রমিক নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রমিক দলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, শ্রমিক সংগঠনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে তাঁরা নতুন একটি সিবিএ বা জেডিএল নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর থেকেই স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষ থেকে তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তাঁর অভিযোগ, বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোর কারণে অনেক নেতাকর্মী সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধার মুখে পড়ছেন। এমনকি কয়েকজনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ওই নেতার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কাজ করা তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এখন নিজেদের সংগঠনেই অসহায় অবস্থায় রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতার সহযোগিতায় বিতর্কিত ব্যক্তিরা নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
শ্রমিক দলের তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজন নেতার অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে সংগঠনের জন্য কাজ করলেও বর্তমানে তাঁরা যথাযথ সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সাংগঠনিক প্রভাবের অভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বলে তাঁদের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একদিকে ত্যাগী শ্রমিক নেতারা নানা চাপের মুখে রয়েছেন, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ের কিছু সুবিধাভোগী নেতা বিতর্কিত প্রার্থীদের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক দলের প্রকৃত কর্মী ও সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে আসন্ন সিবিএ নির্বাচন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক দলের একটি অংশের নেতারা। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা পুনরায় যাচাই, প্রার্থীদের অতীত সাংগঠনিক পরিচয় পরীক্ষা এবং নির্বাচনে সব প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা। অভিযোগকারীদের মতে, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্ব নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা উচিত।
অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পদে কয়েকজন প্রার্থীর অতীত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তাঁদের কাছে কমিটির অনুমোদিত দলিল ও সাংগঠনিক নথি রয়েছে। এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছেও রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন। তবে এসব নথির সত্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইস্টার্ন রিফাইনারির সিবিএ নির্বাচন ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত প্রার্থী, নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও রিফাইনারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
সব মিলিয়ে ১৮ নভেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইস্টার্ন রিফাইনারির শ্রমিক সংগঠনে রাজনৈতিক পরিচয়, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এখন শ্রমিকদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা।






