বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের চুক্তি বা ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ইপিএ ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষর হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ।
বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। দেশে একদিকে মধ্যবিত্ত পরিবারের পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে জাপানি কোম্পানিগুলোও বিদেশে নতুন বাজার খুঁজছে। দুটি দিককে যুক্ত করার একটি বড় সুযোগ রয়েছে। জাপানি কোম্পানিগুলো উচ্চমানের পণ্য, পুঁজি ও প্রযুক্তি দিতে পারে। আর বাংলাদেশ দিতে পারে একটি বড় ও আকর্ষণীয় অভ্যন্তরীণ বাজার। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বাংলাদেশে থাকা জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণ ও মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করতে পারে এবং নতুন কোম্পানিগুলোও এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের চুক্তি বা ইপিএ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের ইপিএ ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষর হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ। এর গুরুত্ব শুধু শুল্ক কমানো বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ধরে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চুক্তিটি বাংলাদেশ ও জাপানকে ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ইপিএ আন্তর্জাতিক মূল্যশৃঙ্খলে আরো ভালোভাবে যুক্ত হওয়ার একটি কাঠামো তৈরি করতে পারে। জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদনশীলতা ও বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়লে বাংলাদেশ ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে ইপিএর সুবিধা চুক্তি থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। ব্যবসায়ীদের নিয়মগুলো বুঝতে হবে এবং সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য সক্ষমতা তৈরি ও চুক্তির সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তা না হলে কোম্পানিগুলো ইপিএ ব্যবহার করবে না।
দুই দেশই বর্তমানে অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াগুলো প্রস্তুত ও চূড়ান্ত করছে। জাপানি ও বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো যত দ্রুত সম্ভব চূড়ান্ত প্রক্রিয়া ও কার্যকর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছ
জাপানি কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ ও প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এর মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ অবশ্যই রয়েছে। তবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য উচ্চমাত্রার আস্থা প্রয়োজন। কোম্পানিগুলো জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো, শুল্কায়ন ও কর ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে।
আগ্রহ আর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। বিদ্যমান কোম্পানিগুলো যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো সমাধান করতে পারলে আগ্রহকে আস্থায় ও আস্থাকে বিনিয়োগে রূপান্তর করা সম্ভব।
আমার দৃষ্টিতে বিনিয়োগ পরিবেশে আরো বেশি নীতিগত স্থিরতা প্রয়োজন। জাপানি কোম্পানিগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করে। তারা পাঁচ, ১০ কিংবা ২০ বছরের কথা বিবেচনা করে। তাই ব্যবসার নিয়ম ও পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে, সেটি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কিছু কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে অপেক্ষা করেছে। তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক মাসে জাপানি কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। গত বছর এমন তৎপরতা দেখা যায়নি। এর অর্থ হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বড় পরিসরে উৎপাদন বাড়াতে হলে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, অনুমানযোগ্য শুল্কনীতি ও উপযুক্ত কর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি উপযুক্ত উৎপাদন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। স্থানীয় কার্যক্রম প্রতিষ্ঠিত হলে কর্মী ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটবে এবং একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে।
বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি অবশ্যই গুরুতর। গ্যাস ও বিদ্যুতের উৎস বহুমুখীকরণে কাজ করছে সরকার। বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। আরো একটি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা শুনেছি। জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আস্থাকে প্রভাবিত করে। এ বিষয়ে বিদ্যমান জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত সরকারকে জানাতে আমরা প্রস্তুত।
বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং প্রতিবেশী ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। এ ভারসাম্য বজায় থাকলে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারেও প্রবেশের সম্ভাবনা দেখতে পারে।
আড়াইহাজার অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিগ-বি উদ্যোগ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ শুধু নিজের অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রেও আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বাংলাদেশে আসার পর আমার নিজের ধারণায়ও পরিবর্তন এসেছে। জাপানে বসে বাংলাদেশকে উৎপাদনের একটি ভিত্তি ও আকর্ষণীয় অভ্যন্তরীণ বাজার হিসেবে জানতাম। এখানে এসে দেখেছি অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও উদ্যমী পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং নতুন ব্যবসা ও জীবনধারা নিয়ে তাদের কৌতূহল আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে জাপান থেকে যা দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বড় সম্ভাবনা এখানে রয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আমি মনে করি। অনেক কোম্পানি সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে সমীক্ষা করছে।
বাংলাদেশ শুধু উৎপাদনের ভিত্তি নয়, দেশের ভোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজারও। বাংলাদেশ সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজ জাপানি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দুই দেশের অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী করতে জেট্রো তার ভূমিকা পালন করে যাবে।







