রক্তাক্ত জুলাই ও রক্তস্নাত আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদের পতন ও গণতন্ত্রের নতুন ভোর। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এক দফার ঐতিহাসিক বিপ্লবে চূর্ণ হয়ে যায় দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ এবং পঙ্গুত্ববরণকারী অগণিত বীর যোদ্ধার স্মরণে আজ দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দিবস।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও অভ্যুত্থানের বিকাশ
২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের যুক্তিসঙ্গত দাবি মেনে না নিয়ে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়ন এবং বলপ্রয়োগের নীতি আন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে।
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে শাহাদাত বরণ করলে পুরো দেশ স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরপরই শুরু হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এবং পরবর্তীতে আন্দোলন রূপ নেয় স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফা দাবিতে। কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও নির্বিচার গুলির তোয়াক্কা না করে রাজপথে নেমে আসে দেশের সর্বস্তরের ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ জনতা।

নিহত ও হতাহতের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
রাষ্ট্রীয় নথিপত্র, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের প্রতিবেদন এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী:
গেজেটভুক্ত ও মোট শহীদ: সরকার প্রকাশিত প্রাথমিক গেজেট অনুযায়ী ৮৩৪ জন শহীদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে বেসরকারি হিসেব ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টে সহিংসতায় নিহতের মোট সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে যায়। আন্দোলন চলাকালে সারা দেশে পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের গুলিতে ২২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। এর মধ্যে ১,০০০-এর বেশি মানুষ স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং প্রায় ৪০০ জন শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিক এক বা দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৬৭ জন শিশু-কিশোর রয়েছে, যাদের সিংহভাগই ছিল স্কুল শিক্ষার্থী। এছাড়া বেশ কয়েকজন গৃহিণী, নারী শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী বুলেটের আঘাতে প্রাণ হারান।
বুলেটের ভূগোল: ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে দেশজুড়ে রক্তপাত
-
রাজধানী ঢাকা: উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, বাড্ডা, সাইনবোর্ড এবং মোহাম্মদপুর এলাকা একেকটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ঢাকা বিভাগেই সর্বোচ্চ সংখ্যক (৪০০-র বেশি) শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ প্রাণ হারান।
-
ঢাকার বাইরে: রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, গাজীপুর, নরসিংদী ও সাভারে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে হেলিকপ্টার থেকে গুলি, সাঁজোয়া যান ও স্নাইপার রাইফেল ব্যবহার করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করা হয়।

৫ আগস্ট: এক দফা এবং ‘লং মার্চ টু ঢাকা’
৪ আগস্ট সারা দেশে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি’র প্রথম দিনেই ৯১ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। এমন পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
৫ আগস্ট সকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা সকল সামরিক-বেসামরিক বাধা, কারফিউ ও ব্যারিকেড ভেঙে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ও গণভবন অভিমুখে রওয়ানা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেলা আড়াইটার দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। রাজপথে নেমে আসে কোটি জনতার বিজয়ের উল্লাস।
বিচার প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নির্মাণ
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) শুরু হয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, আহতদের বিনামূল্যে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা প্রদান এবং ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশের বীর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ইয়ামিন, ওয়াসিম, রিয়া গোপ, ফারহান ফাইয়াজদের ত্যাগকে স্মরণ করে পুরো জাতি অঙ্গীকার করছে—কোনো ধরনের স্বৈরাচার, উগ্রবাদ বা বৈষম্যের স্থান এই নতুন বাংলাদেশে আর হবে না।






