দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি দীর্ঘদিন ধরেই মন্থর। এর প্রভাব পড়েছে ব্যাংক ঋণের চাহিদা ও প্রবাহেও। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই সময়ে জিডিপির তুলনায় সামগ্রিক বিনিয়োগের অনুপাতও ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। অথচ সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির আওতায় এই অর্থবছরের জন্য ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাস্তব ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় অর্ধেক।
বেসরকারি খাতে ঋণের এমন দুর্বল প্রবাহ দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের জিডিপির বিপরীতে মোট বিনিয়োগের অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৯৫ শতাংশ। পরবর্তী তিন বছর ধরে এ অনুপাত কমতে কমতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমেছে আরও বেশি হারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুপাত ছিল ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। গত অর্থবছর শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশে। একই সময়ে সরকারি বিনিয়োগের অনুপাতও কমে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে নেমেছে।
অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও ব্যাংকারদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় বিনিয়োগের অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে এ অনুপাত কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প স্থাপন, বিদ্যমান কারখানার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংক ঋণ পেতে জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ বিভিন্ন কারণে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আগ্রহ কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে এক ধরনের স্থবিরতা রয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।
তিনি বলেন, ঋণের চাহিদা বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে থাকলেও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সম্প্রতি নীতি সুদহার কমানো হয়েছে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি। এসব বাধা দূর হলে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কভিড মহামারীর আগে ২০২০ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। এরপর ধারাবাহিকভাবে এ প্রবৃদ্ধি কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুনে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৩ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমান পর্যায়ে এর আগে কখনো নামেনি। অর্থাৎ দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঋণ সংকোচনের পরিস্থিতি।
তবে ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যে সামান্য ঋণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তার বড় অংশ নতুন বিনিয়োগে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং খেলাপি ঋণের ওপর অনাদায়ী সুদ যুক্ত হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঋণের স্থিতি বাড়ছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা এবং পুনঃতফসিল করা অনেক ঋণ থেকেও নিয়মিত আদায় হচ্ছে না। ফলে নতুন শিল্প বা কারখানা স্থাপনে ঋণ বিতরণের পরিমাণ খুবই কম বলে জানিয়েছেন কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
শিল্প খাতে গ্যাস সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ঘাটতি থাকছে ১ হাজার ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি।
চাহিদার তুলনায় গ্যাসের এ ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগুন ও কারিগরি সমস্যার কারণে টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহেও।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ থাকলেও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে কম সুদের ঋণও বিনিয়োগে বড় ধরনের গতি আনতে পারবে না।
সব মিলিয়ে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ঐতিহাসিক পতন শুধু ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার চিত্র নয়; এটি দেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যবস্থার গভীর সংকটেরও প্রতিফলন। ঋণের চাহিদা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা না গেলে প্রণোদনা কিংবা সুদহার কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।






