চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ১৩টি আড়তে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মুরগির ডিম আসছে বিভিন্ন জেলা থেকে। একটি ট্রাকে গড়ে ১ লাখ ৪৪ হাজার পিস ডিম পরিবহন করা হয়। এমন ১৮ থেকে ২০টি ট্রাক প্রতিদিন চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। পরে এসব ডিম মিনি ট্রাকের মাধ্যমে নগরের বিভিন্ন বাজার, উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী রাঙামাটি জেলায় সরবরাহ করা হয়।
সম্প্রতি কয়েকদিন ডিমের বাজারে দাম বাড়লেও বর্তমানে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ বাড়ায় পাইকারি পর্যায়ে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
রোববার (২ আগস্ট) দুপুরে ডিটি রোডের জান্নাত পোল্ট্রিতে একটি ট্রাকে ডিম নিয়ে আসেন চালক ফজলুল হক। তিনি জানান, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার পিস ডিম নিয়ে চট্টগ্রামে আসতে ট্রাক ভাড়া দিতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, রাত ১টার দিকে ভূঞাপুর থেকে যাত্রা শুরু করেন। পরদিন দুপুর ১টার দিকে চট্টগ্রামে পৌঁছান। ডিম বোঝাই থাকায় পথে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হয়েছে। কারণ অতিরিক্ত ঝাঁকুনিতে ডিম ভেঙে গেলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।
চট্টগ্রাম ডিম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুস শুক্কুর জানান, একটি ট্রাকে ১ লাখ ৪৪ হাজার ডিম পরিবহন করা হয়। ৩০টি ডিম ধরে একটি ক্যারেট বা ট্রেতে। এক ট্রাক ডিম পরিবহনে ছাউনিসহ প্রায় ৬ হাজার ৩০০ ক্যারেট প্রয়োজন হয়। পরিবহন এবং লোড-আনলোডের সময় সাধারণত ২০০ থেকে ৩০০টি ডিম ভেঙে নষ্ট হয়ে যায়।
তিনি জানান, চট্টগ্রামের বাজারে সবচেয়ে বেশি ডিম আসে টাঙ্গাইল থেকে। এছাড়া ঠাকুরগাঁও ও রংপুর থেকেও ডিম আসে। অন্যদিকে হাঁসের ডিমের একটি বড় অংশ আসে কিশোরগঞ্জ থেকে এবং সেগুলোর কিছু ট্রেনের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়।
ডিম ব্যবসায়ীরা বলছেন, শনি ও রোববার পাইকারি বাজারে দাম কিছুটা কমেছে। বর্তমানে প্রতি হাজার লাল মুরগির ডিম প্রায় ১ হাজার ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাদা ডিমের দাম এর চেয়ে প্রায় ৭০ টাকা কম। তবে কয়েকদিন আগেও বাজারে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। তখন প্রতি হাজার ডিম সর্বোচ্চ ১ হাজার ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি পিস ডিমের দাম ১৩ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
ব্যবসায়ীদের মতে, অতিবৃষ্টি ও বন্যায় বিভিন্ন এলাকার পোল্ট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পাশাপাশি মাছ ও সবজির দাম বাড়ার কারণে ডিমের বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছিল। অনেক খামার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সরবরাহ কমে যায়। বিপরীতে চাহিদা বাড়তে থাকায় দামও বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামে প্রতিদিন কত ডিমের চাহিদা রয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুস শুক্কুর বলেন, নগরে ডিমের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। স্কুলের টিফিন, সকালের নাশতা, রোগীর পথ্য থেকে শুরু করে ভাত, বিরিয়ানি, নান-রুটি, পরোটা ও বিভিন্ন ধরনের কেক তৈরিতে ডিমের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
তিনি জানান, পাহাড়তলীর আড়তগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ২৮ লাখ পিস ডিম সরবরাহ করা হয়। এর বাইরে নগরের বড় বড় খামারিরা আরও ৫ থেকে ৬ লাখ ডিম সরবরাহ করেন। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিদিন ৩০ লাখের বেশি ডিমের সরবরাহ রয়েছে।
নগরের কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজারের ডিম ব্যবসায়ী মো. ইকবাল জানান, বর্তমানে প্রতি ডজন লাল মুরগির ডিম ১৫০ টাকা এবং সাদা ডিম ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে হাঁসের ডিম প্রতি ডজন ২২০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ২৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
চেরাগিপাহাড় এলাকাতেও প্রতি ডজন মুরগির ডিম প্রায় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে অলিগলির দোকানে কোথাও কোথাও প্রতি ডজন ১৪৫ টাকায়ও ডিম বিক্রি হতে দেখা গেছে।
এদিকে ডিমের বাজারে বারবার দামের ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে অজুহাত, কারসাজি ও অসম প্রতিযোগিতার কারণে ডিমের দামে স্থিতিশীলতা থাকছে না। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডিমের বাজার স্থিতিশীল রাখতে উৎপাদন ও চাহিদার সঠিক তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কার্যকর সরকারি নজরদারি প্রয়োজন। বড় খামারিদের পাশাপাশি ছোট ও প্রান্তিক খামারিদেরও সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকির আওতায় আনা দরকার। বিশেষ করে বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও গৃহস্থদের সরকারি খামার থেকে মুরগির বাচ্চা সরবরাহের ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।







