পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক বন্দরনগরী গড়ে তুলতে নতুন মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-২০৫০)’ শীর্ষক এই ২৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা চট্টগ্রামের জন্য চতুর্থ মহাপরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শনিবার চউক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করেন চউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। এ সময় তিনি বলেন, অতীতের পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এবার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত নকশার বাইরে কোনো ভবন নির্মাণের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। অতীতে এ ধরনের বিধিনিষেধ থাকলেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।
নতুন মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ড ছাড়াও আনোয়ারা, রাউজান, হাটহাজারী, পটিয়া, সীতাকুণ্ডসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মোট প্রায় ১ হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা এই পরিকল্পনার আওতায় আসছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনায় কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্মুক্ত জলাধার ও খাল রক্ষা এবং সুষম নগরায়ণের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
চউক জানিয়েছে, রোববার থেকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি গ্রহণ করা হবে। নগরবাসী চউক কার্যালয়ে সরাসরি অথবা ডিজিটাল ওয়েব-জিআইএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের মতামত জানাতে পারবেন। সব মতামত পর্যালোচনা শেষে আগামী ডিসেম্বর মাসে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে চউক চেয়ারম্যান বলেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে চট্টগ্রাম তার পাহাড়, খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ হারিয়েছে। নতুন মহাপরিকল্পনায় সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশ রক্ষা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্প পরিচালক আবু ঈসা আনসারী বলেন, একটি নগর পরিকল্পনা শুধু বিশেষজ্ঞদের নথি নয়; স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব প্রয়োজনের প্রতিফলনও হওয়া উচিত। সে কারণেই নাগরিকদের মতামত গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানের কনসালট্যান্ট ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া মনে করেন, নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বাস্তবে তা কতটা অনুসরণ করা হবে সেটিই মূল বিষয়।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, এবারের মহাপরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ভেটিং করা হচ্ছে এবং নাগরিক মতামতও যুক্ত করা হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ থাকবে, যা পরিকল্পনাটিকে আরও কার্যকর করে তুলবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের প্রথম মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। এরপর ১৯৬৫ সালে এর পর্যালোচনা, ১৯৯৫ সালে ২০ বছর মেয়াদি নতুন মাস্টারপ্ল্যান এবং ২০০৮ সালে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করা হয়। ২০১৫ সালে আগের পরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন ২৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় চউক।







