সংশ্লিষ্টরা জানান, নিউট্রন হিট করে ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়। এর পরের ধাপে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে চেইন রিয়েকশনে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে কমপক্ষে ৩৪ দিন।
এ ক্ষেত্রে প্রথমে এক শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে এটি দুই শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হয়। এরপরই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সময় লাগে ৪০ দিনের মতো। প্রতিটি ধাপেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহে এই ফিশন প্রক্রিয়া শেষ হতে পারে বলে জানা গেছে। ফিশন বিক্রিয়া শেষ হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। রোসাটমের একটি সূত্র জানায়, তাড়াহুড়া করে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে চায় না তারা। প্রক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তারা অগ্রসর হতে চায়। সব মানদণ্ড ঠিক রেখে উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে রোসাটম অগ্রসর হচ্ছে। সে অনুযায়ী আগস্টের শেষ সপ্তাহে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এর পাশাপাশি পুরো মাত্রায় অর্থাৎ ১২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনে যেতে আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও জানায় সূত্রটি।
প্রত্যাশা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে আগস্টের শেষ নাগাদ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
এভাবে ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াগুলো অগ্রসর হতে থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিটে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলেও সূত্রগুলো জানায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা তো চেষ্টা করছি ২০২৬ সালে পুরোপুরি উৎপাদনে যাওয়ার। রাশিয়ান বিশেষজ্ঞরা বলছেন আগস্টের শেষ সপ্তাহে ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন শুরু হবে। তারা সব বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। আমরা চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব উৎপাদনে যাওয়ার। দেখা যাক কী হয়।’
রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ অ্যাটমস্ট্রয়।
এই প্রকল্প যতদিন চলবে পুরো সময়ই জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) রাশিয়া থেকে আনা হবে। এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি রয়েছে দেশটির সঙ্গে। পাশাপাশি এই প্রকল্পের পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও রাশিয়া করবে।
এ বিষয়েও বাংলাদেশ ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে একটি আন্তঃসরকার চুক্তি রয়েছে। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট রোসাটমের সঙ্গে আন্তঃসরকারি চুক্তি (আইজিএ) স্বাক্ষর হয়। এই চুক্তির বিষয়বস্তু হলো– ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বর্জ্য (স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল) প্রযুক্তিগত সংরক্ষণ ও রাশিয়ান ফেডারেশনে ফেরত পাঠানো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, চুক্তি অনুযায়ী পারমাণবিক বর্জ্য রাশিয়া নিয়ে যাবে। ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে এই প্রকল্প থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সুরক্ষিত শিল্ডযুক্ত পাত্রে সংরক্ষণ করা হবে। সেগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় ৫ বছর পানিতে ডুবিয়ে রাখা হবে। এরপর সেগুলো স্থানান্তর করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া এই বর্জ্য নির্ধারিত সময়ে নিয়ে যাবে। কীভাবে নেওয়া হবে বা পরিবহন করা হবে সে বিষয়গুলো নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও সূত্রটি জানায়।
সূত্র জানায়, রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি সাধারণ চুক্তির মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী বছরই দ্বিতীয় ইউনিটে ফুয়েল লোড করা হবে বলে জানা গেছে।
এ প্রকল্প নিয়ে এর আগে ২০১৩ সালে সমীক্ষা চুক্তি ও ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া। এ প্রকল্পের ইউনিট দুটিতে রাশিয়ার সর্বশেষ প্রযুক্তির ৩জি প্লাস ভিভিইআর ১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ বা এনপিসিবিএল। এজন্য নিয়ন্ত্রিত ও পেশাদার বিশেষজ্ঞ কর্মী গড়ে তোলা হয়েছে, যাদের অনেকেই প্রকল্পের নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত। চুক্তি অনুযায়ী তাদের বেশিরভাগের প্রশিক্ষণ হয়েছে রাশিয়ায়। তবে শুরুতে রাশিয়ার অপারেটরদের নেতৃত্বেই বিদ্যুৎকেন্দ্র চলবে। যেখানে সহযোগী হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশিরা।
প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হওয়ার তিন বছর পর ধীরে ধীরে পরিচালনার নেতৃত্বে আসবেন বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা। পাঁচ থেকে সাত বছর পর পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কর্মীরাই পরিচালনা করবেন।







