আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভর্তুকির যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের আগে বিশ্ববাজার পরিস্থিতি তিন মাস পর্যবেক্ষণ করবে সরকার।
এই তিন মাস পর্যবেক্ষণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ৯ জুলাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি-সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এই নির্দেশনা দেন।
এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও আইন) মো. হাসানুল মতিনকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়। জ্বালানি খাতের ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ ও পূর্বাভাস দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কমিটি বিশ্ববাজারের জ্বালানি মূল্যের গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি তারা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) প্রকৃত বকেয়া পাওনার পরিমাণ এবং নতুন চালু হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারণে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য আর্থিক দায় নিরূপণ করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বেড়ে গেছে, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে। এ পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলার ব্যয় মেটাতে জ্বালানি বিভাগ সম্প্রতি সিএনজি স্টেশন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পেট্রোবাংলা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেছে, গ্যাসের দাম বাড়ালে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে; এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়বে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সরকারের এই দ্বিমুখী সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার দোটানার মধ্যে রয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে যে বিশাল ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হবে, তা সামাল দেওয়া খুবই কঠিন হবে। সে বিবেচনায় দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিবেচনায় এই মুহূর্তে দাম বাড়ানোর প্রভাব কী হবে, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থান নেই।’
ভর্তুকির চাপ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি তেলে সরকার প্রায় এক যুগ ধরে কোনো ভর্তুকি দেয় না। চলতি অর্থবছরেও এ খাতে ভর্তুকির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।
তবে ইরান যুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এপ্রিল ও মে মাসে ৭ হাজার ৬১০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। যদিও সংস্থাটি দীর্ঘদিনে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে।
এলএনজি আমদানি
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এলএনজিতে ভর্তুকির জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও জুন মাসের বকেয়া ভর্তুকি ও চলতি অর্থবছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে এলএনজি খাতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজি খাতে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির বিপরীতে সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া
গত অর্থবছরের মূল বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
গত দুই মাসে ১০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি পরিশোধ করার পরও আইপিপিগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
ইরান যুদ্ধের আগে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হতো। ইরান যুদ্ধের পর ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে।
গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগের
এ অবস্থায় পরিস্থিতিতে ভর্তুকি কমাতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের গ্যাসের দাম এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে জ্বালানি বিভাগ। সিএনজির মূল্য বাড়ানো হলে পেট্রোবাংলার ১ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করে জ্বালানি বিভাগ বলেছে, এতে রাজস্ব বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জ্বালানি খাতের ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেক কমে যাবে।
তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয় না। তবে গ্যাসের দাম বাড়ালে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও ভর্তুকির আওতায় অন্তর্ভূক্ত করার প্রয়োজন হবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুসাড়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে এলএনজিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।
ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয় ব্যবস্থাপনায় মেরিট অর্ডার ডিসপ্যাচ অনুযায়ী ‘লিস্ট কস্ট’ পদ্ধতি কার্যকরভাবে অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
এছাড়া বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি ও এনার্জি প্রাইস পুনঃমূল্যায়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর এভেইলেবিলিটি ফ্যাক্টরকে প্ল্যান্ট ফ্যাক্টরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুনঃনির্ধারণ ও ডিপেন্ডেবল ক্যাপাসিটি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম তারিখ বিবেচনায় নিয়ে ভর্তুকির নিয়মিত, নির্ভুল ও হালনাগাদ হিসাব সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার সভায় বলেন, বর্তমানে ভর্তুকির আওতাধীন আইপিপি ও যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া পাওনা এবং চলতি অর্থবছরের সম্ভাব্য ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও সরবরাহকারীদের নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রতি মাসের জ্বালানি ভর্তুকির চাহিদা দ্রুততম সময়ে দাখিল করার পরামর্শ দেন তিনি।







