দেশের চলমান গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়াতে একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে সিএনজি স্টেশনগুলোতে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধ করে সেগুলো থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে অতিরিক্ত প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এতে দৈনিক আনুমানিক ৫০০ এমএমসিএফটি গ্যাস সাশ্রয় হতে পারে। সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্পে সরবরাহ করা গেলে কারখানার উৎপাদন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস ঢাকাসহ শিল্পাঞ্চলে পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তারা ট্রাকে করে গ্যাস পরিবহন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিল্প খাতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সিএনজি স্টেশনগুলোতে রেশনিংয়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করছে জ্বালানি বিভাগ। পরিবহন খাতের তুলনায় শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সিএনজি স্টেশনগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ এবং নির্দিষ্ট সময় তা বন্ধ রাখার মতো শিডিউল চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। তবে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে পরিবহন খাতে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গত ১ আগস্ট বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সিএনজি স্টেশন থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত হয়। একই বৈঠকে ভোলা থেকে গ্যাস ট্রাকে পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তাই শিল্পে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পাইপলাইনের পাশাপাশি সিএনজিতে রূপান্তর করে ট্রাকে গ্যাস পরিবহনের সুযোগ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে ভোলার গ্যাস সিএনজিতে রূপান্তর করে ঢাকায় আনার বিষয়ে এখনো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেও ব্যবসায়িকভাবে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংশয় ছিল।
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের একটি অংশ পরিশোধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট বকেয়া প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধের সুপারিশ করা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধ হলে বন্ধ থাকা বেশ কিছু ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
দেশে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। দীর্ঘদিন ধরে বিল না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র জ্বালানি আমদানি ও পরিচালনা ব্যয় মেটাতে সমস্যায় পড়ে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বাড়তি উৎপাদন করা গেলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের হিসাবে, অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলে প্রায় ৫০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সাশ্রয় হতে পারে। এই গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মাত্রা কমানো সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বকেয়া বিলের একটি অংশ পরিশোধ করা হলে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে বন্ধ কেন্দ্রগুলো চালু করা সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি শিল্পের জন্য গ্যাস সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিকসহ বিভিন্ন খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে সিএনজি খাতে গ্যাস ব্যবহারে রেশনিং, অন্যদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে শিল্পের জন্য গ্যাসের জোগান বাড়াতে চাইছে সরকার।







