আমদানি দায় পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, রপ্তানি আয়ে ধীরগতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক আলোচনার পর বাজার প্রত্যাশায় পরিবর্তনের কারণে গত ৩-৪ সপ্তাহ ধরে ডলারের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
গতকাল (২০ জুলাই) কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে রেমিট্যান্সের ডলার কিনেছে। জুলাইয়ের শুরুর তুলনায় এই দর প্রায় ১০ পয়সা বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে আন্তঃব্যাংক ডলারের দর ৭৫ পয়সা বেড়ে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন আন্তঃব্যাংক ডলারের রেফারেন্স রেট ১২২ টাকা ৮৫ পয়সায় ধরে রাখলেও ট্রেজারি কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে এই দরে খুব কমই লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুন মাসেই ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি এলসি দায় পরিশোধ করা হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি খাতের এলসি পরিশোধের চাপ বেশি ছিল। সার ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে।
মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। সাধারণত এলসি খোলার এক থেকে তিন মাসের মধ্যে এর দায় পরিশোধ করা হয়। ফলে মার্চ ও এপ্রিলে খোলা অনেক এলসির পরিশোধের চাপ জুন ও জুলাইয়ে এসে পড়ে।
এ ছাড়া রমজান মাসে খোলা অনেক ইউপিএএস এলসির দায় জুনে পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি জুলাই মাসেও এ ধরনের কিছু এলসির অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, জুনে গত আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় এসেছে। ওই মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ইকোনমিক ইন্ডিকেটরস’ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয় ধীর হলেও আমদানি চাহিদা শক্তিশালী থাকার বিষয়টি এতে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানরা বলছেন, কিছু ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দামে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনছে। এতে পুরো ডলার বাজারে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
তাদের মতে, কিছু ব্যাংক বেশি দামে ডলার কিনে পরে কম দামে বিক্রি করছে, বিশেষ করে সরকারি এলসির দায় পরিশোধের জন্য। প্রবাসী আয়ের ডলার সংগ্রহে এসব ব্যাংকের প্রতিযোগিতা বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছে।
ডলার বাজারে অস্থিরতা তৈরির জন্য কোনো ব্যাংক দায়ী কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি করা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।
সম্প্রতি আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার পর বাজারের প্রত্যাশাতেও পরিবর্তন এসেছে। কর্মকর্তারা জানান, নিলামের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার দর কেন একটি সীমিত পরিসরের মধ্যে থাকছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএমএফ।
ওই বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগের নির্ধারিত রেফারেন্স রেটের পরিবর্তে নিজেদের ওয়েবসাইটে চলতি আন্তঃব্যাংক ডলারের দর প্রকাশ শুরু করে। এতে বিনিময় হার আরও বেশি বাজারনির্ভর হবে—এমন প্রত্যাশা জোরালো হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। এ কারণে বর্তমানে ডলারের দর নির্ধারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না।







