সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং শিল্প নতুন করে গভীর সংকটে পড়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান পূরণে গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড গড়ে তুলতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ, অন্যদিকে একের পর এক হামলা, চাঁদাবাজি, রাস্তা অবরোধ, লুটপাট ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই খাতে বিনিয়োগকৃত বিপুল অর্থ ঝুঁকিতে পড়বে এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের কেন্দ্র সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে একসময় দেড় শতাধিক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পুরোনো জাহাজ আমদানি করে তা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালে রূপান্তরের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের রড শিল্পের বড় একটি অংশের কাঁচামালও আসে এই খাত থেকেই।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে একটি বিদেশি জাহাজ সীতাকুণ্ড উপকূলে আটকে পড়ার পর সেখান থেকেই দেশে শিপ ব্রেকিং শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটে এবং আশির দশকে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পখাতে পরিণত হয়। লোহার পাশাপাশি তামা, পিতল, স্টেইনলেস স্টিল, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ফার্নিচারসহ নানা ধরনের পণ্যের বড় বাজার গড়ে ওঠে এই শিল্পকে ঘিরে।
তবে সময়ের সঙ্গে নানা সংকটে শিল্পটি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিবেশবান্ধব গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতার কারণে প্রতিটি ইয়ার্ডে অতিরিক্ত ১০০ থেকে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এই ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে একসময়কার শতাধিক ইয়ার্ডের পরিবর্তে হাতে গোনা কয়েকটি ইয়ার্ডে কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের সংকটও ব্যবসায়ীদের চাপে ফেলেছে।
এরই মধ্যে নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সম্প্রতি সীতাকুণ্ডের অন্তত সাতটি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে সংঘবদ্ধ চক্র হামলা চালিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিওবি শিপ রিসাইক্লার্স, বারাকা শিপব্রেকিং, সাগরিকা শিপব্রেকিং, জনতা শিপব্রেকিং, ফোরস্টার, মেহেরুন শিপব্রেকিং এবং টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সে মালিক ও কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িতে হামলা চালিয়ে চাঁদা দাবি করা হয়। বারাকা ও সাগরিকা শিপ ইয়ার্ডে যাওয়ার রাস্তা টিনের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জনতা, ফোরস্টার ও মেহেরুন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে মালামালবাহী যানবাহন আটকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে শতাধিক সশস্ত্র দুর্বৃত্ত প্রবেশ করে মালামাল লুটপাট, কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি এবং ইয়ার্ড দখলের চেষ্টা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
একজন শিপ ব্রেকিং উদ্যোক্তা জানান, একশ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে তাদের ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে একটি চক্র রাস্তা দখল করে রাখায় মালামালবাহী গাড়ি প্রবেশ করতে পারছে না। এতে ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ২৩ জুন সীতাকুণ্ডের বানুর বাজারে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিল্পাঞ্চলের অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সের মালিক মো. নুরুন নবী মানিক বলেন, বর্তমানে শিপ ব্রেকিং শিল্প এলাকায় একাধিক চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয়। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে কয়েকজন উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, পুরো শিল্পকে অস্থিতিশীল করে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হলে এই শিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে। নতুন নেতৃত্ব বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বলেও তিনি জানান।
অন্যদিকে সীতাকুণ্ড থানার ডিউটি অফিসার জানান, কয়েকটি অভিযোগ পুলিশ পেয়েছে এবং ঘটনাস্থলে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।







