তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের আশা, এ কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে নতুন বা পুরোনো কূপ থেকে অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগ চললেও সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা থামছে না।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ জুন দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক ১,৮৭১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২০২৬ সালের একই দিনে তা নেমে এসেছে ১,৬৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ এক বছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ২২০ মিলিয়ন ঘনফুট।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানা থেকে। এক বছর আগে যেখানে দৈনিক ৯৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো, বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। ফলে জাতীয় সরবরাহে এ গ্যাসক্ষেত্রের অবদানও আগের তুলনায় কমে গেছে। একইভাবে সিলেট গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
যদিও কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। হবিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, সেমুতাং ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে উৎপাদন বৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে ভোলা গ্যাসক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও প্রয়োজনীয় পাইপলাইন না থাকায় সেখানকার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেই সুযোগও সীমিত। বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানি করা হচ্ছে। অতিরিক্ত আমদানির জন্য নতুন টার্মিনাল স্থাপন প্রয়োজন, যা বাস্তবায়নে অন্তত কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করলেই হবে না; মহেশখালী থেকে দেশের প্রধান বিতরণ নেটওয়ার্ক পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন অবকাঠামোও প্রয়োজন। এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ও দীর্ঘ সময় দরকার, যা বর্তমানে নানা জটিলতায় আটকে আছে।
অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হলেও সেখান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। ফলে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির বড় কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
গত কয়েক বছরে এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, নতুন টার্মিনাল স্থাপন এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে গ্যাস আমদানির নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। ভোলা থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন প্রকল্পও এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হলেও সামগ্রিক বাজেট বৃদ্ধির তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম। সরকার নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপ সংস্কার এবং সাইসমিক জরিপ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
বর্তমানে দেশে অনুমোদিত গ্যাস লোডের পরিমাণ দৈনিক প্রায় ৫,৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট। বাস্তব চাহিদা ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে।
এই ঘাটতি মোকাবিলায় কখনো সার কারখানা, কখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা সিএনজি স্টেশনের গ্যাস সরবরাহ সীমিত করতে হচ্ছে। শিল্প খাতেও দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি কার্যত বন্ধ থাকায় শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ প্রবাহের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।







