ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে এক্সপ্রেসওয়ে মানে উন্নীত করার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে আবারো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুই সরকারি সংস্থা—সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ।
একদিকে সওজ বিদ্যমান মহাসড়ককে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত ১০ লেন এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরের বিস্তারিত নকশা চূড়ান্ত করেছে, অন্যদিকে সেতু কর্তৃপক্ষ একই করিডোরে করছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর উন্নয়নে দুই সংস্থার পৃথক পরিকল্পনা কাজটিকেই পিছিয়ে দেবে বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ২৩১ কিলোমিটার অংশকে ছয় লেনের টোলভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে এবং উভয় পাশে চার লেনের সার্ভিস লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রণীত নকশা অনুযায়ী মূল সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, পরামর্শক ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ মোট প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণের কাজ চলছে বর্তমানে। প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) নীতিগত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে সওজ।
সংস্থাটির প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, যাত্রাবাড়ী থেকে মদনপুর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার ও চট্টগ্রামের সলিমপুর থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সাইনবোর্ড, শিমরাইল, মদনপুর, বারইয়ারহাট, আবুতরাব বাজার ও সলিমপুরে নির্মাণ করা হবে ফ্লাইওভার। মূল এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সরাসরি ওঠানামা সীমিত রেখে এটিকে একটি প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত মহাসড়কে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান দৈনিক অর্থনীতিকে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে একটি প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত মহাসড়কে রূপান্তর করা। এতে মূল সড়কের সঙ্গে কোনো ফিডার রোডের সরাসরি সংযোগ থাকবে না। ফলে যাতায়াত হবে আরো দ্রুত ও নিরাপদ।’ অর্থায়নের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সওজ। এরই মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মতি দিয়েছে। পাশাপাশি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন সওজের প্রকৌশলীরা।
তবে একই সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ডিজাইন ফর কনস্ট্রাকশন অব ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ দৈনিক অর্থনীতিকে বলেন, ‘এখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বের সুযোগ নেই। সরকার যে পরিকল্পনাকে সবচেয়ে টেকসই, সাশ্রয়ী ও জনকল্যাণমুখী মনে করবে, সেটিই বাস্তবায়ন হবে। আমাদের দায়িত্ব হলো প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও তথ্য-উপাত্ত সরকারের সামনে উপস্থাপন করা।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমরা এ প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই করছি এবং এ বিষয়ে একটি স্টাডি পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকার যাকে দিয়ে এ স্টাডি করাবে এবং তার ভিত্তিতে যে পরিকল্পনাটি সবচেয়ে বেশি টেকসই, সাশ্রয়ী ও জনকল্যাণমুখী হবে, সেটিই বিবেচনা করা হবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো কীভাবে কাজটি করলে সাশ্রয়ী হবে এবং দ্রুততম সময়ে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে একটি কার্যকর ও দ্রুতগতির পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যাবে। স্টাডির মাধ্যমে এ বিষয়গুলো উঠে আসবে এবং আশা করি সরকার তখন একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা মূলত স্টাডি করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে উপস্থাপন করব। সরকার যদি মনে করে সওজ অধিদপ্তরের পরিকল্পনাটি ভালো, তবে সেটাই গ্রহণ করবে। আবার সরকার যদি আমাদের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটিকে শ্রেয় মনে করে, তবে সেটি বাস্তবায়ন হবে। আমরা কেউই সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে নই। আমাদের কাজ হলো সঠিক তথ্য দিয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা।’
ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে মতপার্থক্য অবশ্য নতুন নয়। ২০০৮ সালে এডিবির অর্থায়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। ২০১৩ সালে প্রকল্পটি পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের অনুমোদন পায় এবং অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনালকে বিস্তারিত নকশা তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। সে সময় ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ একই রুটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিলে প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়। পরে সেতু কর্তৃপক্ষ সেই উদ্যোগ থেকে সরে এলেও ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান চার লেন মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণের নির্দেশনা দেন।
সাত বছর পর আবারো একই করিডোরে নতুন করে দুটি পৃথক পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এখন কোন মডেলটি বাস্তবায়ন হবে, তা নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং চলমান সমীক্ষাগুলোর ফলাফলের ওপর।
সম্পাদক/ডিও







