চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যা শিল্প ও বাণিজ্য খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দুর্বলতা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে এই অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি কমে গেছে। চলতি অর্থবছর শেষ না হলেও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, গত বছরের তুলনায় বিনিয়োগ আরও কমতে পারে। এর আগের বছরেও বিনিয়োগ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একসময় দেশের প্রধান বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামে কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের নতুন বিনিয়োগ আসছে না। বন্দরকেন্দ্রিক কিছু প্রকল্পে আশার কথা শোনা গেলেও সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনালে কিছু বিনিয়োগ হলেও বে টার্মিনাল ও লালদিয়ার চরসহ বড় প্রকল্পগুলো এখনো কার্যকরভাবে এগোয়নি।
অন্যদিকে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার হার কমে গেছে, বরং অনেক গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু বড় শিল্পগ্রুপ আর্থিক সংকটে পড়ে ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে। মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সীমিত পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগের উদ্যোগ থাকলেও তা সামগ্রিক চিত্র বদলাতে পারেনি। কর্ণফুলী টানেল ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বিনিয়োগ বাড়ার যে প্রত্যাশা ছিল, তাও পূরণ হয়নি। এছাড়া চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী ইপিজেডে নতুন শিল্প স্থাপনের মতো জায়গার সংকটও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই বন্দরের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি। পাশাপাশি সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের অভাব বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চীন, জাপান, কোরিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় সম্ভাব্য বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রামে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪১২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ১ হাজার ৩৮ কোটি টাকা, যা শতাংশ হিসেবে প্রায় ৩০ ভাগ হ্রাস।
ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা এই পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ জমিমূল্য, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ব্যাংক ঋণপ্রাপ্তির জটিলতাকে দায়ী করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার পর তা যথাযথ বিনিয়োগে ব্যবহার না হওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর একটি সূত্র জানায়, বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কারখানা স্থাপন করেনি। ফলে কেবল আশ্বাস নয়, বিনিয়োগকারীদের জন্য বাস্তবসম্মত ও আস্থাবান পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।







