দেশের শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন। শিল্পায়নের অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত ও জীবনমান উন্নয়নে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি সহায়ক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে।
ফাউন্ডেশনটি মূলত তিনটি খাতে—মৃত্যু, চিকিৎসা ও শিক্ষা—শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছরে ৩৬ হাজার ২৪০ জন শ্রমিক ও তাদের পরিবারকে মোট ১৬৮ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৩৫৫ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসা খাতেই সবচেয়ে বেশি সহায়তা গেছে, এরপর রয়েছে শিক্ষা ও মৃত্যুঝুঁকিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
এছাড়া ২০২২ সাল থেকে সীমিত পরিসরে পেনশন সুবিধাও চালু হয়েছে, যার আওতায় শ্রমিক বা তাদের পরিবার মাসিক ভাতা পাচ্ছেন।
তবে এই ইতিবাচক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক এখনও ফাউন্ডেশনের সুবিধা সম্পর্কে জানেন না। আবার সহায়তা পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া অনেক সময় জটিল হওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফাউন্ডেশনকে আরও কার্যকর করতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি, আবেদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, তদারকি জোরদার এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রান্তিক শ্রমিকদের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ফাউন্ডেশনের তহবিল মূলত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে গঠিত হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০০টি প্রতিষ্ঠান এই তহবিলে অর্থ জমা দিচ্ছে, যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও নিয়ম মেনে অবদান রাখছে না।
ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারের জন্য এককালীন অনুদান, দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা সহায়তা, উচ্চশিক্ষায় অর্থ সহায়তা, জরুরি চিকিৎসা ব্যয় এবং মাতৃত্বকালীন সহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে শ্রমিকরা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। তাই শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোম্পানির নিট মুনাফার একটি অংশ শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর একটি অংশ এই ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা পড়ে, যা শ্রমিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যথাযথ সংস্কার ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতে দেশের শ্রমজীবী মানুষের জন্য আরও শক্তিশালী সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।






