দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপ্লব আনার প্রত্যাশা থাকলেও কমিশনিং হওয়ার দু-বছর পরেও চালু করা যায়নি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প। মূলত অপারেটর নিয়োগে বিলম্ব ও দরপত্র প্রক্রিয়া ঘিরে দানা বাঁধা বিতর্কেই প্রকল্পটি থমকে রয়েছ।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং—এসপিএম হলো একটি ভাসমান জেটি, যার সঙ্গে ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ অফশোর ও অনশোর পাইপলাইন যুক্ত। এর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি উপকূলীয় ডিপোতে তরল জ্বালানি পাঠানো যাবে। এতে লাইটার জাহাজ (ছোট জাহাজ) ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। ফলে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুই-ই সাশ্রয় হয়।
কক্সবাজারের মাতারবাড়ী দ্বীপ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে সাগরে অবস্থিত এসপিএম দুটি পাইপলাইনের সাথে সংযুক্ত। বড় মাদার ট্যাংকার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল প্রথমে মহেশখালীর স্টোরেজ টার্মিনাল, এরপর সেখান থেকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ফ্যাসিলিটিতে নিতে এগুলো স্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে এর কমিশনিং হয়। প্রথমে নির্মাণকারী চীনা ঠিকাদারকে অপারেটর হিসাবে নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকার পরে এ সিদ্ধান্ত বাতিল করে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে।
এতে সাড়া না পেয়ে শর্ত সংশোধন করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আবারো দরপত্র ডাকা হয়েছিল। এতেও এখনো অপারেটর চূড়ান্ত করা যায়নি।
পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলেন, এসপিএম পুরোদমে চালু হলে দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়বে আরও ২ লাখ টন, যা দিয়ে দেশের প্রায় ১০ দিনের জ্বালানি চাহিদা মেটানো যাবে।
তারা আরও বলেন, বর্তমানে জাহাজের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে তেল খালাসে যেখানে ১১ দিন সময় লাগে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তা মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এতে লাইটার জাহাজ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দূর হওয়ায় বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
দুই দফায় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেও এখন পর্যন্ত কোনো পরিচালন সংস্থা বাছাই করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। অথচ এরইমধ্যে প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে—যা কোনো আয় না করা একটি প্রকল্পের জন্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্রের দলিল প্রস্তুতকারী পরামর্শক সংস্থা নিয়োগের বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে এখনও অনুমোদন না মেলায় দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি বিরাজ করছে। এই অনুমোদন ছাড়া দরপত্রের বিস্তারিত মূল্যায়ন কার্যক্রম যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।
একইসঙ্গে অভিযোগ উঠেছে যে, দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা অধিক প্রতিযোগীর অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে। এটি মূলত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিপিপিইসি) লিমিটেডকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চীনা প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে প্রাথমিক পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়ে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
দরপত্র প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত বলা হলেও, অল্প সীমিত অংশগ্রহণ এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্মাণ ঠিকাদারকেই অপারেটর হিসেবে নিয়োগের বারবার ব্যর্থ চেষ্টার কারণে প্রকল্পটির কার্যক্রম চালু করতে বিলম্ব হচ্ছে।
বিপিসি সূত্র জানায়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রথমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীনে নির্মাণ ঠিকাদার চীনা প্রতিষ্ঠানকেই নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই পরিকল্পনা বাতিল করে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে।
গত নভেম্বর মাসে প্রথম দফার দরপত্র ডাকা হলেও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে পূর্ণ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত না হওয়ায় গত নভেম্বরে তা বাতিল করা হয়।
পরে ডিসেম্বরে পরামর্শক সংস্থা আইএলএফ কনসাল্টিংয়ের সহযোগিতায় দরপত্র দলিল প্রস্তুত করে আবারও দরপত্র আহবান করা হয়। দুই দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পর সর্বশেষ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উন্মুক্ত করা হয়। ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও শেষপর্যন্ত দরপত্র দাখিল করেছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান—পিটি পার্টামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল, সিপিপিইসি ও হিলং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং (হংকং) লিমিটেড।
কর্মকর্তারা বলে, পরামর্শক সংস্থাটি প্রকল্পের নির্মাণ ঠিকাদারের সঙ্গে আগেও অন্যান্য প্রকল্পের কাজ করেছিল। আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার আগেই সংস্থাটি দরপত্র দলিল তৈরি করে দিয়েছে। ফলে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয় পরামর্শক সংস্থার ফি কমানোর নির্দেশ দেওয়ায় তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। ফলে দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
এর আগের দরপত্রে এক ডজনেরও বেশি কোম্পানি দরপত্র কিনলেও জমা দেয় মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান—বয়া প্রস্তুতকারক ব্লুওয়াটারের সঙ্গে সিপিপিইসির যৌথ উদ্যোগ এবং ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পারতামিনা। এর মধ্যে সিপিপিইসি-ব্লুওয়াটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং পারতামিনার প্রস্তাবিত দর বাজেটের চেয়ে বেশি ছিল।
দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি
প্রকল্পটির নির্মাণ পর্যায় থেকেই দীর্ঘসূত্রতা ছিল। ২০১৫ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা ও বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর। অথচ প্রকল্পটির ঋণ চুক্তি কার্যকর হয় ২০১৮ সালে।
এরপর চার দফায় মেয়াদ সাড়ে পাঁচ বছর বাড়ানোর পাশাপাশি ৬৭ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে তিন বছরের কাজ সম্পন্ন হয় ৯ বছরে।
কমিশনিংয়ের পরও অপারেটর নিয়োগে বিলম্ব চলতে থাকে। প্রথমে চীনা ঠিকাদারকেই বিশেষ বিধানের আওতায় অপারেটর নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিতর্কিত আইনটি বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার।
পরে একই চীনা প্রতিষ্ঠানকে জিটুজি ভিত্তিতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার হিসেবে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় নিয়োগের বিষয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক সাবেক সরকারের উপদেষ্টা জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম টিবিএসকে বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা উচিত।
‘এটি দ্রুত চালু করা উচিত। অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আর ব্যয় এত বৃদ্ধি কেন, বারবার সময় কেন বাড়ল, এসব বিষয় তদন্ত হওয়া উচিত। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত,’ বলেন তিনি।







