দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা অবস্থাতেই দায়িত্ব নিয়েছে নতুন সরকার। টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমছে, বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল—ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতাও কমে গেছে।
অন্যদিকে আর্থিক খাতেও দেখা দিয়েছে গভীর সংকট। কয়েকটি ব্যাংক সচল রাখতে সরকারকে তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
বৈদেশিক খাতে প্রবাসী আয় কিছুটা বাড়লেও রপ্তানি দুর্বল রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন করে ঝুঁকি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। ফলে বাস্তব আয় কমে গিয়ে বাজারে চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে এতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি কমানো এবং বিনিয়োগ সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি—দ্বিমুখী চাপ
অর্থনীতির সামনে এখন বড় দ্বন্দ্ব—মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, নাকি কর্মসংস্থান বাড়ানো। কারণ সুদহার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমে, কিন্তু বিনিয়োগ কমে গিয়ে বেকারত্ব বাড়তে পারে। আবার অর্থ সরবরাহ বাড়ালে কর্মসংস্থান বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। ফলে এখনই প্রবৃদ্ধির চেয়ে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত আয় বৃদ্ধির কারণে দেশে দারিদ্র্য আবার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে প্রায় ২১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে।
একই সঙ্গে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ এখন শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। মধ্যবিত্তের অংশ কমে যাওয়ায় ভোক্তা চাহিদাও দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
কর্মসংস্থানে বড় ঘাটতি
২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। অনেকেই বাধ্য হয়ে কম উৎপাদনশীল খাতে কাজ করছেন।
বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। শহরে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক সংকেত।
বিনিয়োগে আস্থার সংকট
বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আস্থার ঘাটতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা।
সরকারি খাতে ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
ব্যাংক খাত সংস্কার এখন জরুরি
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট ঋণের বড় অংশই এখন ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি ও অর্থ পাচারের কারণে এই খাত দীর্ঘদিন ধরে সমস্যায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো সম্ভব নয়।
জ্বালানি খাত নতুন ঝুঁকির কেন্দ্র
জ্বালানি সংকট ইতোমধ্যে শিল্প ও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
সরকারের সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত—জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, আর না বাড়ালে ভর্তুকির চাপ বাড়বে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয়ের চাপ
সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ায় বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, যা উন্নয়ন ব্যয় টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়।
অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সংকুচিত হচ্ছে।
এ জন্য চাই নতুন বিনিয়োগ
অন্তর্বর্তী সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন সরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ; আর এখন সরকারি খাতের ঋণ বেড়ে হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ আরও কমে হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। এমনকি জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগও অনেক কমে গেছে।
বিনিয়োগের এতটা দুরবস্থা করোনা মহামারির সময়েও ছিল না। জ্বালানিসহ অবকাঠোমার সমস্যা আগে থেকেই ছিল, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল আস্থাহীনতা। সরকার বেসরকারি খাতের আস্থা অর্জনের কোনো চেষ্টাও করেনি; বরং কারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিক। এ অবস্থায় নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানো।
সম্পাদক/ডিও







