মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে উদ্ভূত জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এরই অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি আফ্রিকান রাষ্ট্রকে তেল রপ্তানির অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নাইজেরিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিয়াহ মো. মাইনুল কবির গত মাসে আবুজায় নাইজেরিয়ার পেট্রোলিয়াম রিসোর্স (গ্যাস) বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী একপেরিকপে একপোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানান।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের শুরু থেকে একপেরিকপে একপো নাইজেরিয়ার গ্যাস খাতের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু কর্তৃক নিযুক্ত এই মন্ত্রী নাইজেরিয়ান গ্যাস মাস্টার প্ল্যান-২০২৬ এবং স্থানীয় কন্টেন্ট রূপান্তরের বিষয়টি তদারকি করছেন।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত শুরু হয়, তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটকে তীব্র করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশ বিকল্প উৎসের সন্ধানে নেমেছে।
বর্তমানে আফ্রিকায় বাংলাদেশের ৯টি কূটনৈতিক মিশন রয়েছে। এগুলো হলো—আলজিয়ার্স (আলজেরিয়া), কায়রো (মিশর), আদ্দিস আবাবা (ইথিওপিয়া), নাইরোবি (কেনিয়া), ত্রিপোলি (লিবিয়া), পোর্ট লুইস (মরিশাস), রাবাত (মরক্কো), আবুজা (নাইজেরিয়া) এবং প্রিটোরিয়া (দক্ষিণ আফ্রিকা)। গত মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই মিশনগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির বিষয়ে আলোচনা শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং আফ্রিকার মিশনগুলোর প্রতিনিধিরা চলতি মাসের শেষের দিকে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে একটি জুম মিটিং করার পরিকল্পনা করছে।
ইতোমধ্যেই আলজেরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নাজমুল হুদা জ্বালানি আমদানির বিষয়ে সেদেশের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে, মরক্কোতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সাদিয়া ফয়জুন্নেসা পেট্রোলিয়াম সরবরাহের নতুন পথ ও সম্ভাবনাগুলো খতিয়ে দেখছেন।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমান বাংলাদেশের প্রধান পেট্রোলিয়াম সরবরাহকারী দেশ। মূলত সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির মাধ্যমে এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হয়। এছাড়া আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বিবেচনা করছে।
আফ্রিকার দেশগুলোর তেল উৎপাদন সক্ষমতা পর্যালোচনায় দেখা যায়, নাইজেরিয়ার দৈনিক উৎপাদন ১৫-১৬ লাখ ব্যারেল, লিবিয়ার ১২-১৩ লাখ ব্যারেল, অ্যাঙ্গোলার ১০-১১ লাখ ব্যারেল এবং আলজেরিয়ার উৎপাদন ৯-১০ লাখ ব্যারেল। অন্যান্য দেশের মধ্যে মিশর ৫-৬ লাখ, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ২.৫-৩ লাখ, গ্যাবন ২-২.৩ লাখ, ঘানা ১.৭-২ লাখ, দক্ষিণ সুদান ১.৫-১.৭ লাখ এবং নিরক্ষীয় গিনি ৯০ হাজার থেকে ১.২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। এছাড়া চাদ, সুদান, ক্যামেরুন, সেনেগাল এবং মৌরিতানিয়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল উৎপাদন করছে।
উল্লেখ্য, গত ৫৫ বছরে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ কখনোই পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করেনি। আফ্রিকান জ্বালানি খাতে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও চীনের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের প্রভাব থাকায় এসব অঞ্চলের তেল বিশ্ববাজারে সহজলভ্য করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, এ বছরের ২৫ মার্চ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি আলজেরিয়া সফর করেন। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি অংশীদারিত্ব জোরদার করাই ছিল তার সফরের মূল লক্ষ্য। দুই দেশ আশির দশক থেকে যুক্ত থাকা ট্রান্সমেড (মাত্তেই) পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি এবং অফশোর অনুসন্ধানে সহযোগিতা জোরদারে একমত হয়েছে। সফরকালে মেলোনি লেবাননের সামরিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তবে আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার মধ্যেও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে কোনো জ্বালানি ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় এ বছর সরবরাহ ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে।







