ইরান যুদ্ধের প্রভাবে অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) কাজাখস্তান থেকে প্রতি ব্যারেল ৭৬ দশমিক ৪১ ডলার দরে ১ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।
এক্সনমোবিল কাজাখস্তান থেকে এই ক্রয়ের উদ্যোগটি এমন সময়ে নেওয়া হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি কৌশলগত কূটনৈতিক অগ্রগতি তৈরি হয়েছে।
১১ মার্চ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনকে ভারতের মতো বাংলাদেশকেও রাশিয়ার তেল আমদানিতে অস্থায়ী ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানান।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, জাতীয় অর্থনীতি সহায়তা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে করা এই অনুরোধ ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বর্ধমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ বিঘ্নের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে কাজাখস্তান থেকে ডিজেল কেনার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এক্সনমোবিল কাজাখস্তান কাস্পিয়ান অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের অনেক প্রকল্পে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা থাকে; তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত বিধি মেনে চলছে।
ওয়াশিংটনের এই সহযোগিতামূলক অবস্থানের কারণে সরকার প্রতি ব্যারেল ৭৬ দশমিক ৪১ ডলারের এই চুক্তি অনুমোদন করতে পেরেছে, যা বাজারের অন্যান্য প্রস্তাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
তবে নতুন সরবরাহকারীদের বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, কিছু প্রতিষ্ঠান আরও কম দামে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি আসায় সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়নি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, এক্সনমোবিল তাদের নিজস্ব মূল্যায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাজারের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে।
তিনি বলেন, আজ (১ এপ্রিল) ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। চুক্তি স্বাক্ষর ও এলসি খোলার ১৫ দিনের মধ্যে উচ্চমানের কম সালফারযুক্ত এই ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
আরও দুটি জ্বালানি আমদানি প্রস্তাব
এক্সনমোবিল কাজাখস্তান চুক্তির পাশাপাশি কমিটি আরও দুটি জ্বালানি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাবে ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিন থেকে জি-টু-জি চুক্তির আওতায় ৬০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল কেনা হবে, যার প্রতি ব্যারেলের মূল্য (৫ দশমিক ৩৩ ডলার প্রিমিয়ামসহ) ২২১ দশমিক ০৮ ডলার।
অন্য প্রস্তাবে মালয়েশিয়াভিত্তিক আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার প্রতি ব্যারেলের মূল্য (১৫ ডলার প্রিমিয়ামসহ) ১৩৭ দশমিক ১৪ ডলার।
এদিকে বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে বৈঠকে আরও তিনটি জ্বালানি আমদানির প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এপ্রিলে জ্বালানির দাম বাড়ছে না
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে এপ্রিল মাসে জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায়—বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপ যা ভোক্তাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে—এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা।
কর্মকর্তারা বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ানো হলে তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে সরকার মনে করে।
একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে ভাড়া বাড়বে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি তৈরি হবে। এর প্রভাব দ্রুত রান্নাঘরের বাজার ও নিত্যপণ্যের দোকানে ছড়িয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেবে।’







