ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধান তিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান চুক্তির ‘ফোর্স মেজার’ ধারা কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ওমানভিত্তিক ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড গত ৫ মার্চ প্রথম ফোর্স মেজার নোটিশ দেয়। এর পরদিন একই ধরনের সিদ্ধান্তের কথা জানায় যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি। এর আগে ২ মার্চ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী কাতারএনার্জিও একই ধারা কার্যকর করে।
ফোর্স মেজার এমন একটি আইনি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষ চুক্তির দায়বদ্ধতা সাময়িকভাবে স্থগিত বা বিলম্বিত করতে পারে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আরফানুল হক বলেন, তিন সরবরাহকারীর এই সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণে এখন বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে স্পট মার্কেট থেকেও অতিরিক্ত এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এপ্রিল মাসে আসার কথা থাকা অন্তত আটটি এলএনজি কার্গোর সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ছয়টি এবং স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থায় আরও দুটি কার্গো ছিল।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এপ্রিলে মোট ১১টি কার্গো আমদানির লক্ষ্য ছিল—এর মধ্যে তিনটি স্পট মার্কেট থেকে কেনার কথা। কিন্তু সরবরাহকারীদের ফোর্স মেজার ঘোষণায় সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় কাতারএনার্জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বৈশ্বিক এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশই এই প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে তাদের প্রায় ৪০টি কার্গো পাঠানোর কথা ছিল।
ওকিউ ট্রেডিং ও এক্সিলারেটের সরবরাহ ব্যবস্থাও অনেকাংশে কাতারএনার্জির উৎসের ওপর নির্ভরশীল। চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও ফোর্স মেজার কার্যকর হওয়ায় সেই পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ওকিউ ট্রেডিংয়ের ঘোষিত স্থগিতাদেশ অন্তত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। ফলে ৩ ও ৮ এপ্রিলের নির্ধারিত দুটি কার্গো সরবরাহও বাতিল হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার উদ্যোগ জোরদার করেছে। এ জন্য চারটি কার্গো কেনার লক্ষ্যে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতেও গ্যাস কেনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিস্থিতি সহজ নয়। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহে সক্রিয় হওয়ায় স্পট মার্কেটে প্রতিযোগিতা ও দাম—দুই-ই বাড়ছে।
সম্প্রতি স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম ছিল প্রায় ১০–১১ ডলার, সাম্প্রতিক লেনদেনে তা বেড়ে প্রায় ১৫ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এমনকি সাম্প্রতিক দরপত্রে বাংলাদেশকে ২৪ থেকে ২৮ ডলার পর্যন্ত দামে কার্গো কিনতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, সম্প্রতি দুটি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছানোয় মজুত কিছুটা বেড়েছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকায় জ্বালানি ব্যবহারে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারে রেশনিং নীতিই চালু থাকবে।
প্রদা/ডিও







