মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্রেন্ট ব্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৮ দশমিক ৭৭ ডলার পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর এক দিনে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি। গত সপ্তাহেই তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছিল। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকেরা।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৮ থেকে ১০৯ ডলারের মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। একদিনেই প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি দাম বেড়েছে। একই সময়ে নাইমেক্স লাইট সুইট ক্রুডের দামও ১০৬ থেকে ১০৮ ডলারের মধ্যে উঠেছে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি বাজারের অস্থিরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশ জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপও বাড়তে পারে।
জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে তেলের দাম বাড়লে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এতে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে হতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানির পাওনা প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার বড় অংশই বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটা বিদেশ থেকে আনা হয়, যার বড় অংশ আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে।
এ ছাড়া পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কনডেনসেট থেকে পেট্রোল, অকটেনসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের পর এই প্রথমবারের মতো তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ক্রেতা দেশগুলো বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় ব্যাহত থাকে, তাহলে তেলের দাম দ্রুত ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হবে।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি দেশ অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনা করছে।
বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদনে খরচ বাড়া এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর প্রভাব খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রায় সব খাতে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে জ্বালানি খাতের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জ্বালানি ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের চাপ রয়েছে।
তবে বাস্তবে জ্বালানির দাম বাড়ালে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বেড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সরকারকে একদিকে বাজেট চাপ, অন্যদিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছালে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য জ্বালানি মজুত বাড়ানো, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। তবে স্বল্পমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তারা।
সৌজন্য: বাংলাদেশ প্রতিদিন
প্রদা/ডিও







