দখল নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যেই সারাদেশে খাল শনাক্ত ও মানচিত্রভুক্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে জলপথগুলোকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে খালগুলোর শ্রেণিবিন্যাস ও জিও-ইনফরমেশনভিত্তিক ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ৩১ দশমিক ৫৭ কোটি টাকার একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নিয়েছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়ে গেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দেশে আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি খাল রয়েছে। তবে বিএস বা আরএস খতিয়ানে অনেক খালের অস্তিত্ব এখন আর স্পষ্ট নয়। বহু স্থানে খাল ভরাট করে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বর্তমানে নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভান্ডার থাকলেও খাল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত কোনো ডেটাবেজ নেই। ফলে খাল খনন, পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ও দ্বৈততা দেখা যায়।
জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার (আইডব্লিউআরএম) ধারণা অনুযায়ী সারা দেশের খালগুলোর উৎপত্তিস্থল, আউটফল, প্রবাহপথ, বেসিন ও সাব-বেসিন চিহ্নিত করে একটি জিও-ইনফরমেশন সিস্টেমভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে।
খালের ধরন, কার্যকারিতা ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা বিবেচনায় খালগুলোকে বড়, মাঝারি ও ছোট—এই তিন ভাগে বিভক্ত করা হবে।
এ ছাড়া গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কালভার্ট, সেতু ও রেগুলেটরসহ অবকাঠামোর তথ্য সংগ্রহ করে ডেটাবেজে যুক্ত করা হবে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে সংরক্ষিত সিএস ও আরএস মানচিত্র এবং ঐতিহাসিক নথি ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।
এর আগে ‘বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহের তথ্যাদি হালনাগাদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাহমান নদীগুলোর তথ্য হালনাগাদ করা হয় এবং একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়। নতুন খাল প্রকল্পের ডেটাবেজ সেই নদী ডেটাবেজের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অভ্যন্তরীণ খাল ও বিল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। তবে দেশে এখনো খালের কোনো মানসম্মত শ্রেণিবিন্যাস নেই। ফলে বিভিন্ন সংস্থা অপরিকল্পিতভাবে খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে এবং এতে দ্বৈততা তৈরি হচ্ছে।
কর্মকর্তারা মনে করেন, একটি স্থায়ী ও তথ্যনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি হলে ভবিষ্যতে পানি সম্পদ পরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সম্প্রসারণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল মিলবে। সংস্থাভিত্তিক দায়িত্ব স্পষ্ট হলে সমন্বয় বাড়বে এবং অপচয় কমবে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে খাল খনন কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়েছে। দলটি একে ‘সামাজিক বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, সরকার গঠন করলে পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খনন বা পুনঃখনন করা হবে। এটি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ের কর্মসূচির আধুনিক সংস্করণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় অন্তত এক হাজার কিলোমিটার খালের খননকাজ দৃশ্যমান করা হবে।
এদিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম তদারকিতে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি সেল গঠন করেছে।







