হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া চাপ প্রত্যাখ্যান করছে ওমান। মাস্কাট জোর দিয়ে বলছে যে, তারা তেহরানের সাথে কেবল হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছে যা আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও)-এর সাথে পরামর্শ করার পরেই এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা কার্যকর করা ওমানের লক্ষ্য।
ঐতিহাসিকভাবেই ওমান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং হরমুজ প্রণালির যৌথ তত্ত্বাবধায়ক। তারা সাধারণত নেপথ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে, যা তাদের পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন বিবাদে নিরপেক্ষ থাকতে সহায়তা করে।
তবে ওমানের এই নিরপেক্ষতারও একটি সীমা আছে। তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ইসরায়েলের অবজ্ঞার কঠোর সমালোচক। অন্যদিকে, বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানি হামলার নিন্দা জানিয়ে গত বুধবার ওমান একটি বিবৃতিও জারি করেছে।
কিন্তু গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক তাৎক্ষণিক মন্তব্যে ওমানের ওপর বোমা হামলার হুমকি দিয়ে সালতানাতটিকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। গত মঙ্গলবার সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওমানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীতে ইরান ছাড়া অন্য কোনো দেশ নেই—এবং সম্ভবত ওমান যারা এর সাথে সখ্যতা দেখিয়েছিল—যারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে।”
ওমান অবশ্য ট্রাম্পের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক বাদানুবাদে জড়ানো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। তবে গত সপ্তাহে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে ওমানের ওয়াশিংটন রাষ্ট্রদূত তালাল বিন সুলেমান আল-রাহবি যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, সালতানাতটি ‘টোল’ বা যাতায়াত মাশুল ব্যবস্থার বিরোধী এবং তারা নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার নীতি বজায় রাখবে।
ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তির অংশ হিসেবে তারা এক মাসের মধ্যে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছুক। তবে দেশটি ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ (পিজিএসএ) নামে একটি সংস্থা গঠন করেছে, যেখান থেকে জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি নিতে হবে। উল্লেখ্য, এই সংস্থাটির ওপর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ওমানের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে ইরান এখন জাহাজগুলোর ওপর একটি ‘অ-বৈষম্যমূলক ফি’ আরোপের প্রস্তাব দিচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ অধিদপ্তরের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কেন্দ্রের প্রধান আরমান খোরসান্দ চলতি সপ্তাহে বলেছেন, “বিষয়টি কেবল প্রণালি দিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজের কাছ থেকে মাশুল নেওয়া নয়। এর উদ্দেশ্য হলো পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা এবং ‘সাধারণ যাতায়াত’-এর নীতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির ক্ষতিপূরণ দেওয়া।”
তিনি আরও বলেন, “এই অঞ্চলে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযানগুলো কেবল নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটই তৈরি করেনি, বরং পরিবেশের ওপরও এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত নীতি অনুযায়ী, ক্ষতির জন্য যারা দায়ী, তাদেরই সংস্কার বা প্রতিকারের ব্যয়ভার বহন করা উচিত।”
সাঈদ লায়লাজের মতো ইরানের অন্যান্য বিশ্লেষকরা অবশ্য প্রণালি থেকে সরাসরি অর্থ উপার্জনের বিষয়ে সরকারকে খুব সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ জোট গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পারে। এর পরিবর্তে এই এলাকাটিকে শান্তির অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুললে আরও বেশি সমৃদ্ধি আসবে।
ইরানের সংসদের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ বলেছেন, সরকারের সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে এবং এটি স্থায়ী নাকি অস্থায়ী হবে, তা নির্ধারণে তিনটি ভিন্ন খসড়া আইনকে একীভূত করার চেষ্টা চলছে।
তবে আইএমও-এর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ গত ২৭ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক প্রণালিতে কোনো দেশের পক্ষ থেকে পেমেন্ট বা টোল, ফি বা কোনো বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।”
তা সত্ত্বেও, নির্দিষ্ট এবং প্রকৃত সেবার বিপরীতে ফি নেওয়ার বিষয়ে কিছু ওমানি রাজনীতিবিদ সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। ওমানের শুরা কাউন্সিলের সদস্য মোহাম্মদ সুলেমান তামিম আল-হিনাই বলেন, ওমান আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার নীতি বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, “ওমানের পরিবহন মন্ত্রী ইতিপূর্বে শুরা কাউন্সিলে বলেছিলেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীও নিশ্চিত করেছেন যে, ওমান আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করে। সুতরাং ওমান প্রণালিতে কোনো ট্রানজিট ফি আরোপ করে না, তবে এর বদলে সুরক্ষা, উদ্ধার অভিযান এবং নেভিগেশনাল সহায়তার মতো অন্যান্য সামুদ্রিক সেবা প্রদান করে থাকে।”
যুক্তরাষ্ট্র এখনো সন্দেহ করছে যে, ওমান গোপনে এমন একটি ফি ব্যবস্থার পরিকল্পনা করছে যা মূলত ‘টোল’ বা মাশুলের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। যদিও যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ওমান মার্কিন জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযানকে নেভিগেশন গাইডেন্স, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান এবং নাবিকদের চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে আসছে।
বিপরীতে, ইরানের পিজিএসএ দেখানোর চেষ্টা করছে যে তাদের এই নতুন ব্যবস্থা একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান যার নিয়মাবলী বিভিন্ন কোম্পানি মেনে চলছে। সংস্থাটি তথ্য প্রকাশ করেছে যে, এ পর্যন্ত ৩০০টিরও বেশি শিপিং কোম্পানি অনুমতির জন্য আবেদন করেছে। বহির্গামী জাহাজগুলোর প্রধান গন্তব্য ছিল এশীয় দেশগুলো, বিশেষ করে চীন ও ভারত এবং আগত জাহাজগুলোর প্রধান গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে, ইরানি রাডারে মার্কিন হামলাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো ইরানকে সেই নজরদারি সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত করা, যা তাদের এই নতুন সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজন।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গত ২৯ মে জানিয়েছে, কোনো অর্থ প্রদান করা হোক বা না হোক, মার্কিন নাগরিকদের জন্য ইরান সরকারের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ, যার মধ্যে “নিরাপদ যাতায়াতের গ্যারান্টি সংক্রান্ত সেবাও” অন্তর্ভুক্ত।
সমুদ্র আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা এবং সামুদ্রিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে তাদের আঞ্চলিক জলসীমায় যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এছাড়া তারা চলাচলকারী জাহাজগুলোকে দেওয়া নির্দিষ্ট পরিষেবার জন্য চার্জও আরোপ করতে পারে, যদি সেই চার্জ স্বচ্ছভাবে এবং কোনো বৈষম্য ছাড়াই করা হয়।
ওমানের ওপর মার্কিন এই সন্দেহের সূত্রপাত মূলত ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে, যখন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি মার্কিন টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে আলোচনার জন্য আরও সময় চেয়েছিলেন। ওমান সেই আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল এবং তিনি জানিয়েছিলেন যে একটি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কাছেই রয়েছে।







