স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে মসৃণ উত্তরণের স্বার্থে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ বা রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, এই চুক্তিটি চরমভাবে বৈষম্যমূলক এবং এটি তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে স্বাধীনভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে খর্ব করবে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিন ও তারপর’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ আহ্বান জানান সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে মসৃণ রূপান্তর কৌশল বা এসটিএস বাস্তবায়নে জোর দেওয়া জরুরি। এসটিএসের মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ। কিন্তু গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি সই করেছে, তা এই রূপান্তর কৌশলের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। চুক্তিটি বাস্তবায়ন হলে সুবিধাজনক উৎস থেকে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
সিপিডির উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে এই চুক্তির বেশ কিছু ক্ষতিকর ও নিয়ন্ত্রণমূলক ধারা তুলে ধরা হয়। অসম এই চুক্তিতে মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর রেসিপ্রোকাল বা পারস্পরিক শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ চুক্তির কোনো শর্ত পালনে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক বসাতে পারবে।
এছাড়া স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মেজার্স এবং টেকনিক্যাল স্ট্যান্ডার্ডের বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ তৃতীয় এমন কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তৃতীয় দেশের কোম্পানির বিরুদ্ধেও বাংলাদেশকে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা হয়েছে এই চুক্তিতে।
ড. মোয়াজ্জেম আরও বলেন, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে সম্পূর্ণভাবে মার্কিন বর্ডার মেজার্স বা সীমান্ত নীতি মেনে চলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পণ্যের ওপর বাংলাদেশ কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক কর বা ভ্যাট আরোপ করতে পারবে না। এছাড়া দেশের সেবা খাত মার্কিন সেবাদাতাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রবেশ করতে চাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের ওপর বাংলাদেশ নিজস্ব কোনো শর্ত দিতে পারবে না।
ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এই চুক্তিতে কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই চুক্তির ফলে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বাংলাদেশ কোনো ধরনের ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। এমনকি ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ক্ষেত্রে কাস্টমস ডিউটি বসানো থেকেও বাংলাদেশকে বিরত থাকতে হবে।
দেশের খনিজ ও জ্বালানি খাতের ওপরও এই চুক্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি। সংস্থাটি জানায়, চুক্তিতে দেশের ‘ক্রিটিক্যাল মিনারেল’ বা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং জ্বালানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতি মেনে চলা এবং তৃতীয় দেশ থেকে আসা বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ করার শর্তও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া পারমাণবিক পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ‘ডিউটি ইভেশন এগ্রিমেন্ট’ বা শুল্ক ফাঁকি রোধ চুক্তিতে সই করার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
সিপিডি জানায়, যেহেতু চুক্তির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ‘নোটিফিকেশন’ বা পত্র বিনিময় সম্পন্ন হয়নি, তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নতুন সরকারের উচিত কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা। প্রয়োজনে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার আলোকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে নতুন করে দরকষাকষির পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা এ চুক্তির পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের একেবারে শেষ মুহূর্তে (৯ ফেব্রুয়ারি) জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) পুনরায় পর্যালোচনার তাগিদ দেয় সিপিডি। ড. মোয়াজ্জেম জানান, এই চুক্তিতে জাপান থেকে এলএনজি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াবে।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির অন্যান্য গবেষক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার হিসেবে শুধু ঢাকা-কেন্দ্রিক না হয়ে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ খাতে ‘নো ইলেকট্রিসিটি নো পে’ নীতি চালু, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও রাজস্ব খাতে ন্যায়পাল নিয়োগ এবং শ্রম আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি জানানো হয়।
প্রদা/ডিও







