শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে চীনের কৌশলগত প্রভাব স্পষ্টভাবে বেড়েছে। রাজনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের পর এই প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে ভারতকে পুরোপুরি পাশ কাটানো বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।
২০২৪ সালে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং শেখ হাসিনা ভারতে স্ব-নির্বাসনে রয়েছেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে যেসব দল এগিয়ে রয়েছে, তাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অতীতে খুব একটা উষ্ণ ছিল না—বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলের প্রেক্ষাপটে।
এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা জোরালো হয়েছে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিতভাবে রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, শত কোটি ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বিস্তারের বিষয়গুলো এসব আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, দেশের একটি বড় অংশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত দমন–পীড়নের দায় ভারতের সঙ্গেও যুক্ত। তার ভাষায়, “যে দেশ একজন বিতর্কিত নেতাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখে, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জনগণ সহজে মেনে নেবে না।”
তবে তারেক রহমান নিজে তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তবে তা হতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্রিকেটকে ঘিরে টানাপোড়েন দুই দেশেই আলোচনার জন্ম দেয়। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের চাপের মুখে আইপিএল থেকে এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়া হয়। এর জবাবে ঢাকা আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কিছু ম্যাচ ভারত থেকে সরানোর অনুরোধ জানায়। সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান হওয়ায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া দুই দেশ নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়াও সীমিত করেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বৈঠক খুব একটা দেখা যায়নি। যদিও গত ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বারবার ভারতকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও নয়াদিল্লি এতে সাড়া দেয়নি। এরই মধ্যে ঢাকার একটি আদালত গণ-অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসিনা।
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ তুলছে। বিএনপি জামায়াতের পাকিস্তানঘেঁষা রাজনীতির সমালোচনা করছে, আর জামায়াত বিএনপিকে ভারতের কাছাকাছি বলছে। এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান এক জনসভায় বলেন, “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ।”
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় ভারতকে ভবিষ্যৎ সরকার যে দলই গঠন করুক, তাদের সঙ্গেই বাস্তববাদী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তবে এই ফাঁকে চীন ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে ও নেপথ্যে তার প্রভাব বিস্তার করছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই চীন থেকে আমদানি। হাসিনার পতনের পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। বিপরীতে, একসময় সক্রিয় ভারতীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন চুক্তি তেমন হয়নি।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস-এর বিশ্লেষক কনস্টান্টিনো জ্যাভিয়ার বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন নিজেকে আরও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে।
তবে বিশ্লেষকরা একমত যে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত বাংলাদেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তার জন্য নয়াদিল্লির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও বিদ্রোহ দমনে ভারতেরও ঢাকার সহযোগিতা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, “বাংলাদেশের চীন ও ভারত—উভয়কেই প্রয়োজন। কোনো সরকারই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার ঝুঁকি নেবে না।”
তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভারতের প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। জামায়াতঘেঁষা জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, “এটি শুধু নির্বাচনী স্লোগান নয়। নয়াদিল্লির আধিপত্যবোধ তরুণদের মধ্যে গভীরভাবে কাজ করছে এবং এটি এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় ইস্যু।”
প্রদা/ডিও







