ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভের আড়ালে বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে খুচরা ব্যবসা, পর্যটন, পরিবহন ও স্থানীয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ক্ষতি কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির বাণিজ্য খাতের প্রতিনিধিরা।
গত ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস, মার্সেই, বোর্দো, নিস ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন স্থানে দোকানপাটে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরদিন ১৮ অক্টোবর এসব ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়ে। রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের সময় দেশজুড়ে ব্যাপক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। [সূত্র: Reuters, AFP, ১৮ অক্টোবর ২০২৬]
দেড় হাজার দোকানে ভাঙচুর, ক্ষতি কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো
আন্দোলন ঘিরে ফ্রান্সের ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে খুচরা বিক্রয় খাতে। দেশটির বাণিজ্য ও বিতরণ খাতের প্রতিনিধিদের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১ হাজার ৫০০ দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য লুট, কাচ ও দরজা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং স্থাপনা মেরামতের ব্যয় মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে।
ফ্রান্সের বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারেফুরের প্রধান নির্বাহী আলেক্সান্দ্র বোমপার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২০টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি ইউরোতে পৌঁছাতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন। ফলে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট দোকান, সুপারমার্কেট, পোশাকের শোরুম ও অন্যান্য খুচরা বিক্রেতারাও আর্থিক চাপের মুখে পড়েছেন।
তবে কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোর এই হিসাব মূলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতির প্রাথমিক অনুমান। দেশটির সামগ্রিক অর্থনীতিতে মোট ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পর্যটন ও পরিবহন খাতেও বাড়ছে উদ্বেগ
ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, সড়কে পোড়া যানবাহন ও ভাঙচুরের চিহ্ন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে পর্যটকদের চলাচল ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিক্ষোভের সময় প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটনসেবা, ট্যাক্সি ও অন্যান্য পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দোকানপাট বন্ধ রাখা, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়তি ব্যয়ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে দেশজুড়ে বিমানবন্দর বা বড় ব্যাংকগুলো বন্ধ রয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতির বিষয়টি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
গ্রেপ্তার, আহত ও সরকারি সম্পদের ক্ষতি
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। এএফপি প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন এবং অন্য কয়েকটি প্রতিবেদনে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। আহত পুলিশ, অগ্নিনির্বাপণকর্মী ও অন্যান্য ব্যক্তির সংখ্যাও সংবাদমাধ্যমভেদে ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
লিমোজ শহরের ১৯ শতকের ঐতিহাসিক টাউন হলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সরকারি স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির গুরুতর উদাহরণ। এ ধরনের স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, সড়ক পরিষ্কার, পোড়া যানবাহন অপসারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। তবে এসব খাতে মোট ব্যয়ের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।
ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে সরকারের উদ্যোগ
আন্দোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা মূল্যায়ন ও সহায়তার সম্ভাব্য ব্যবস্থা নির্ধারণে ফ্রান্সের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের ১৮ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, বাণিজ্য, কারুশিল্প, পর্যটন, রেস্তোরাঁ, ব্যাংক ও বিমা খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক আয়োজনের কথা জানানো হয়।
বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব মূল্যায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দেওয়ার সম্ভাব্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা। এ উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, তাৎক্ষণিক সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা টিকিয়ে রাখাও সরকারের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে শঙ্কা
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আন্দোলনের কারণে ব্যবসা বন্ধ থাকা, পণ্য ও সম্পদের ক্ষতি, মেরামত ব্যয় এবং ভোক্তাদের ব্যয় করার প্রবণতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সীমিত নগদ প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
এর পাশাপাশি ফ্রান্সের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনঅসন্তোষ এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে এই আন্দোলনের কারণে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কতটা কমবে, কর্মসংস্থানে কী পরিমাণ প্রভাব পড়বে কিংবা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কতটা বাধাগ্রস্ত হবে—তা নির্ধারণের মতো পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে সাম্প্রতিক আন্দোলন দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোর সম্ভাব্য ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কা অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা হলেও চূড়ান্ত আর্থিক প্রভাব নির্ভর করবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা কতটা দ্রুত চালু হয় এবং সরকার কী পরিমাণ সহায়তা দিতে পারে তার ওপর।






