রাজধানী ও গতকাল রাজধানীর রামপুরা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর ও কারওয়ান বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সপ্তাহ আগের দামের তুলনায় মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম বেড়েছে। কিছু সবজির দাম কমলেও তা ১০০ টাকার আশপাশে। এমনকি তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই ও সিলভার কার্পের মতো কম দামি মাছও বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৪৫০ টাকায়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূলত সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারভেদে চাহিদার ওঠানামা দামের ওপর প্রভাব ফেলছে। এছাড়া সবজির দাম বাড়ার কারণ কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
কাঁচাবাজারে আমদানির পর কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমে বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। তবে কোনো কোনো বাজারে ২২০ টাকার বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।
মরিচের দাম কিছুটা কমে এলেও এখনো প্রায় সব সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। একই সঙ্গে ডিম, মাছ ও মুরগির দাম বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে পেঁয়াজ, রসুন, সয়াবিন তেলসহ কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের বাজারের পরিমাণ কমে আসছে। এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে আসার তথ্য দিলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই।
বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কাঁচামরিচ ১৮০-২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া বরবটি ১২০, করলা ১৩০, বেগুন ১২০-১৪০, টমেটো ১২০, লাউ ১০০, ঢেঁড়স ৯০, পটোল ৮০, চিচিঙ্গা ১০০, ঝিঙা ৯০, কাঁকরোল ৯০, পেঁপে ৬০, কচুরছড়া ৮০, আলু ৩০ টাকায়, যা এক সপ্তাহে আগে ১০-২০ টাকা কম ছিল।
বাজারে কিছু সবজির দাম বাড়ার কারণ উৎপাদন পর্যায় থেকে সরবরাহ কম বলে দাবি করেন কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মনির হোসেন। আমদানির কারণে মরিচের দাম কিছু কমছে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় সবজির ক্ষতি হয়েছে। সেজন্য মাঝে কাঁচামরিচের দাম বেড়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত হয়। তবে এখন আমদানি বাড়ায় দাম কমে আসছে। ১২০ টাকায়ও বিক্রি করছি। সবজির দাম বাড়ার কারণ হচ্ছে পর্যাপ্ত গাড়ি রাজধানীতে আসছে না। যার কারণে পণ্য কম থাকলে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াতে পারে।’
সবজির মতো দাম বেড়েছে মাছ, মুরগি ও ডিমের। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য ও বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্রয়লার মুরগি ১৯০-২১০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া মাছের মধ্যে রুই আকারভেদে ৩৫০-৫৫০ টাকা, কাতলা ৩৫০-৫০০, তেলাপিয়া ২৮০-৩০০, পাঙাশ ২৮০, মৃগেল ৪০০, কোরাল ১ হাজার ১০০, সিলভার কার্প ৩২০, টেংরা ৬০০, বাগদা চিংড়ি ১ হাজার ২০০, রূপচাঁদা ১ হাজার ৪০০, মলা ৬০০, ইলিশ আকারভেদে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৫০ টাকা।
ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানি ঈদের পর থেকে মুরগির দাম বাড়তে শুরু করেছে। তবে কয়েকদিনে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সরবরাহের ঘাটতি ও গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব বাজারে পড়েছে। তারা জানান, পরিবহন খরচ প্রায় ৮-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লে বাজারে আরো বড় প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
মুরগি ও ডিমের দাম বাড়লেও স্থিতিশীল পেঁয়াজ, রসুনের দাম। তবে সরবরাহ কমে আসছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। গতকালের বাজারে পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা, রসুন ১০০-১৮০ টাকা, আদা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। অন্যদিকে চালের বাজারে নাজিরশাইল ও মিনিকেট জাতের সরু চাল ৭৫-৮৫ টাকা, পাইজাম ও আটাশ জাতের ৬০-৬৫, মোটা চালের দাম ৫৫-৫৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে সুগন্ধি চাল।
এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। যদিও সরকার বাজার যাচাই করে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশের তথ্য দিয়েছে। তবে তার বাস্তব প্রতিফলন বাজারে পাওয়া যায়নি। শেওড়াপাড়া বাজার থেকে নিয়মিত বাজার করেন কাজীপাড়ার বাসিন্দা খাদিজা আক্তার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছ, মুরগি, ডিমসহ প্রয়োজনীয় সবজির দাম প্রতিদিন যেন বেড়ে চলছে। গত সপ্তাহে যে সবজি ৬০ টাকা ছিল এটি এখন ৮০-৯০ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ল। অনেক পণ্যের দাম ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে আমাদের বাজারের পরিমাণ কমে আসছে। যেমন আগে তিন থেকে চার কেজি ওজনের মুরগি নিলেও আজ (গতকাল) নিয়েছি দেড় কেজি ওজনের। অন্যান্য পণ্যেও পরিমাণ কমছে।’
আরেক ক্রেতা সাফওয়ান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, বাজার তদারক করতে হবে। বাসায় গ্যাস-বিদ্যুৎ নাই আর বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জন্য বেঁচে থাকা দায়। অথচ সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কথাই বলছে না।’
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রব্যমূল্যের দাম কমাতে হলে উৎপাদক থেকে রাজধানীর বাজার পর্যন্ত সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখা এবং কোন পর্যায়ে কী হারে দাম বাড়ছে, তা নিয়মিত নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। তা না হলে একটির দাম কমলেও অন্য পণ্যের বাড়তি দাম সামগ্রিকভাবে ভোক্তার ওপর চাপ থাকবে।







