নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অভিযান চললেও খোদ সিডিএর বরাদ্দ দেওয়া বাণিজ্যিক ভবনেই মানা হয়নি নির্মাণবিধি। নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজারের আমতল এলাকায় সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের আটতলা ভবনে পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে অন্তত ১৬০টি দোকান। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকান কোটি টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে।
শুধু পার্কিং নয়, ভবনটির অগ্নিনিরাপত্তা, লিফট, এসকেলেটর এবং সিঁড়ি নির্মাণেও নকশা ও অনুমোদনের শর্ত মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ভবনটিতে প্রবেশ করলে স্বাভাবিকভাবে চলাচল ও শ্বাস-প্রশ্বাসে পর্যন্ত ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
সিডিএ সূত্রে জানা যায়, আমতল থেকে নিউ মার্কেট হয়ে পুরাতন রেলস্টেশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে কয়েক শ হকার দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা করছেন। এতে ওই এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই যানজট সৃষ্টি হয়। হকারদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে আমতল এলাকায় সিডিএ হকার্স মার্কেট নির্মাণ করা হয়। মার্কেটটির নাম দেওয়া হয় ‘সিডিএ নিউ হকার্স মার্কেট ক্ষুদ্র দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’। মার্কেটের জমি ২০৪ জন হকারের নামে বরাদ্দ দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাউকেই সেখানে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা হয়নি।
বরং বর্তমানে সড়কের ওপরই তিন সারিতে হকার বসে ব্যবসা করছেন। আর সিডিএর মার্কেট ভবনের বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক দোকান।
২০০১ সালের ২২ নভেম্বর ভবন নির্মাণের অনুমতিপত্রে ১৫টি শর্ত দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ নম্বর শর্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়, নকশায় দেখানো স্থান ছাড়া অন্য কোথাও গাড়ি রাখা যাবে না। একই শর্তে পার্কিংয়ের খালি জায়গায় কোনো ধরনের দোকান বা ইমারত নির্মাণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ১৩ নম্বর শর্তে ভবনের প্রতিটি তলায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি প্রকাশ্য স্থানে স্থাপন এবং এর ব্যবহারবিধি লিপিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেট ভবনে পার্কিংয়ের কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই। পার্কিংয়ের স্থান দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে ১৬০টি দোকান। স্থানীয় দোকানদারদের অভিযোগ, প্রতিটি দোকানই কোটি টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে।
মার্কেটের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ২০৪টি করে দোকান রয়েছে। আর চতুর্থ তলা থেকে প্রতিটি ফ্লোরে ৫২টি করে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
একাধিক দোকানদার বলেন, পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান নির্মাণ করে বিক্রির মাধ্যমে শত কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করা হয়েছে। ভবনের প্রতিটি তলায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, লিফট ও এসকেলেটরের জন্য জায়গা রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে সেসবের কোনো ব্যবস্থা নেই। ভবনের সিঁড়িগুলোও অত্যন্ত সরু।
সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মার্কেটটির নকশা সিডিএর অথরাইজড বিভাগে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক আগেই নকশাটি ‘গায়েব’ করে ফেলা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তাদের অভিযোগ, মার্কেটের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে ভবনের একেক তলা নির্মাণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই ভবনটির নির্মাণকাজ চলেছে। এতে সিডিএর কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জানা যায়, মার্কেটের পার্কিং থেকে দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছিলেন মোহাম্মদ মোতালেব চৌধুরী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কেটের জায়গা সিডিএ থেকে ২০৪ জনের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পার্কিং ও দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত তিনি নির্মাণ করেছেন।
তিনি বলেন, “২০১৬ সালে দ্বিতীয় তলা থেকে আটতলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছেন সেলিম উল্লাহ। পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান নির্মাণ করা হয়েছে—এটা সত্য। তবে অন্যান্য তলায় নকশাবহির্ভূত কাজ সম্পর্কে আমার ধারণা নেই।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সেলিম উল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন ভবনে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে সিডিএর অভিযান চলমান রয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন স্কুল ও বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে ভবনের নকশা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পার্কিং নিশ্চিত করার তাগিদও দিয়েছেন সিডিএ চেয়ারম্যান।
আমতল সিডিএ মার্কেটের বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল—সবগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে আমতল সিডিএ মার্কেটের অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেব।”
অন্যদিকে সিডিএর অথরাইজড অফিসার তানজীব হোসেন বলেন, “আমি যতটুকু শুনেছি, এ মার্কেট নিয়ে একটি মামলা চলমান রয়েছে। মামলা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমাদের আইন শাখা দেখছে। তাই এ বিষয়ে তারাই ভালো জানবেন।”
সিডিএর বরাদ্দ দেওয়া একটি মার্কেটেই অনুমোদনের শর্ত ভেঙে পার্কিং দখল, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ রিয়াজউদ্দিন বাজার এলাকায় এমন একটি ভবনে অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে দ্রুত ভবনটির অনুমোদিত নকশা যাচাই, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।







