দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব ক্রমেই গভীর হচ্ছে জ্বালানিনির্ভর উৎপাদনশিল্পে। বিশেষ করে প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পে উৎপাদন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গ্যাসের নিম্নচাপ ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। আবার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের অভাবে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন ইউনিট স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করলেও এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজি আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে। অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ায় কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
সক্ষমতার ৩০-৪০ শতাংশে প্লাস্টিক কারখানা
প্লাস্টিক শিল্পের ইনজেকশন মোল্ডিং, ব্লো মোল্ডিং ও এক্সট্রুশনসহ বিভিন্ন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই ধরনের জ্বালানি সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।
বিদ্যুৎ চলে গেলে ব্যাকআপ জেনারেটর চালানোর ক্ষেত্রেও গ্যাসের নিম্নচাপ সমস্যা তৈরি করছে। ফলে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার মুনাফাও কমছে।
বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামালের সংকট, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সমস্যা এবং কার্যকরী মূলধনের ঘাটতির কারণে এরই মধ্যে প্রায় ৩০০টি প্লাস্টিক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত।
বিপিজিএমইএর সভাপতি শামীম আহমেদ বলেন, বর্তমানে অনেক প্লাস্টিক কারখানা তাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।
তার মতে, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা ছাড়া প্লাস্টিক শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। কারখানার কোনো একটি উৎপাদন মেশিনও যদি সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চালানো সম্ভব হয়, তাতেও উৎপাদন সচল রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে।
গ্যাসের নিম্নচাপে ঝুঁকিতে সিরামিক উৎপাদন
প্লাস্টিকের পাশাপাশি গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে সিরামিক শিল্পে। টাইলস, টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারি পণ্য তৈরির জন্য ব্যবহৃত কিলন বা চুল্লিগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে উচ্চ তাপমাত্রায় পরিচালনা করতে হয়। গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে গেলে চুল্লির তাপমাত্রা ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা কাঁচামাল ও আধা-প্রস্তুত পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ সিরামিক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) সহসভাপতি রশীদ মাইমুনুল ইসলাম বলেন, দেশের অনেক সিরামিক কারখানা বর্তমানে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছে না। কোথাও কোথাও উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, সিরামিক উৎপাদনে চুল্লির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রায় স্থির রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার কারণে সেই তাপমাত্রা ধরে রাখা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পণ্যের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিকল্প হিসেবে এলপিজি ব্যবহার করলেও সমস্যা পুরোপুরি কাটছে না। কারণ এলপিজির দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে বাড়তি খরচ পণ্যের দামে যুক্ত করে ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগও সীমিত।
রপ্তানি ও নতুন বিনিয়োগেও শঙ্কা
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শুধু বর্তমান উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে না; এর প্রভাব পড়ছে নতুন বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণেও। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। আবার যেসব প্রকল্প এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে পারছে না।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্লাস্টিক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।
তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের একটি অংশ বিকল্প উৎস হিসেবে ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে শুধু বর্তমান রপ্তানি আয় নয়, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সিরামিক পণ্য বিশ্বের শতাধিক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। একইভাবে প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানিও গত কয়েক বছরে সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই দুই শিল্পের রপ্তানি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
সব মিলিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন আর কেবল সাময়িক উৎপাদন ব্যাঘাতের বিষয় নয়; প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানি বাজার, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ—সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি সংকটের সমাধান করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি দেশের শিল্পায়নের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।







