হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে, নতুন একটি অস্থায়ী রুট তৈরির বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপাতত কোনো বৈঠক বা আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে না বলে আজ সোমবার জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দুই দেশের মধ্যকার প্রধান প্রধান বিরোধগুলো নিয়ে সোমবারই নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। ট্রাম্পের সেই দাবির জবাবেই মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব কথা জানান। ট্রাম্প দাবি করেন, গত সপ্তাহান্তে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেকোনো দেশের ওপর সবচেয়ে বড় হামলাটি ইরানের বিরুদ্ধে চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। তবে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ফোন করে কূটনৈতিক সমাধানের অনুরোধ জানানোর পর তিনি সেই হামলা স্থগিত করেন। তবে ইরান দ্রুত চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্তেই কেবল এই হামলা বাতিল করা হয়েছে বলে সতর্ক করেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধে এ নিয়ে দ্বাদশবারের (১২তম) মতো ট্রাম্প তাঁর ঘোষিত হামলার হুমকি থেকে পিছিয়ে এলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন রুটের প্রস্তাব
হরমুজ প্রণালিতে একটি নতুন ‘অন্তর্বর্তী রুট’ বা নৌপথ তৈরির বিষয়ে বাঘাইয়ের এই মন্তব্যকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান এই প্রণালির ওপর পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করছে এবং জাহাজকে সামুদ্রিক সেবা দেওয়ার বিনিময়ে ফি আদায়ের প্রক্রিয়াসহ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও নতুন পথ নির্ধারণের বিষয়ে বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে।
প্রস্তাবগুলোর একটি হলো– একটি ওমান-ইরান যৌথ কোম্পানি গঠন করা, যা বিমা কোম্পানিগুলোর দেওয়া চড়া মূল্যের সেবা কম খরচে প্রদান করবে এবং কিছু নির্দিষ্ট দেশের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক শুল্কের (প্রিফারেনশিয়াল ট্যারিফ) ব্যবস্থা রাখবে।
প্রণালি দিয়ে একটি সর্বসম্মত ও গ্রহণযোগ্য পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হলেই কেবল গত ১৮ জুন উভয় পক্ষের স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অন্যান্য শর্তগুলো বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে। তবে এই স্মারকের বাধ্যবাধকতা নিয়ে মতবিরোধের জের ধরেই নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে লোহিত সাগর ও ইরাকেও ছড়িয়ে পড়ে।
গত সপ্তাহে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানান, হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশকারী জাহাজগুলোকে উত্তর দিকে ইরানের কাছাকাছি রুট ব্যবহার করার দাবি জানাচ্ছে তেহরান, তবে কিছু জাহাজ দক্ষিণ দিকের পথও ব্যবহার করতে পারে। দুই রুটের মধ্যে সমানভাবে জাহাজ চলাচল ভাগ করা এবং তৃতীয় কোনো দেশ কর্তৃক মাইন অপসারণ (ডি-মাইনিং) কার্যক্রম শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
ওমানের সঙ্গে আলোচনা ও মার্কিন অবস্থান
আজ তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই বলেন, “আমরা এখন এমন একটি করিডোর নিয়ে কথা বলছি যার একটি আসা-যাওয়ার রুট থাকবে, দুই বা তিনটি পৃথক রুট নয়। একটি স্থায়ী রুট নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী রুটটি সাময়িকভাবে ব্যবহার করা হবে।”
যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত দীর্ঘদিনের ‘ট্রান্সপোর্ট সেপারেশন স্কিম’-এর বিকল্প হিসেবে এই নৌপথটিকে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, উভয় পক্ষের মধ্যে এ সংক্রান্ত মানচিত্রও বিনিময় করা হয়েছে।
বাঘাই জোর দিয়ে বলেন, ওমানের সঙ্গে এই আলোচনা দ্বিপাক্ষিক এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি জানান, ওমানের সঙ্গে গত সাত থেকে আট দিন ধরে এই আলোচনা চলছে। এছাড়া সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির কোনো বৈঠক নির্ধারিত ছিল না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, “হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পারে এমন একটি রুটের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে আমরা মনোযোগ দিচ্ছি। ওমানের পরামর্শ ও সহযোগিতায় যত দ্রুত সম্ভব একটি পথ নির্ধারণ করাই আমাদের প্রচেষ্টা; যা মূলত সাময়িক হবে। এর ওপর ভিত্তি করে আমরা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে পারব।”
তবে নৌপথ নিয়ে চুক্তি হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না বলে উল্লেখ করেন বাঘাই। ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত নৌ-অবরোধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে প্রণালির সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না।
বাঘাই ইঙ্গিত দেন যে, ওমানের সঙ্গে এই আলোচনা কেবল একটি নিরাপদ নৌপথেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, “সাধারণত আইন অনুযায়ী, দুই উপকূলীয় রাষ্ট্রের মধ্যে জাহাজ চলাচলের যেকোনো সমঝোতায় উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব, সার্বভৌম অধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা, জাতীয় স্বার্থ এবং সামুদ্রিক সেবাসংক্রান্ত সব বিষয় অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হয় ও পরীক্ষা করে দেখা হয়।”







