বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক বছরে একের পর এক নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার বহর বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এর বাইরে ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টির অর্ডার এপ্রিলে এবং আরও ১১টির অর্ডার সেপ্টেম্বরে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এর পাশাপাশি আগামী অক্টোবরে আরও ১০টি এয়ারবাস কেনার জন্য চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিমানের বহরে যুক্ত হবে মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ। তখন সংস্থাটির মোট বহর দাঁড়াবে ৫৪টিতে।
এই সংখ্যা চলতি বছরের শুরুতে সংসদে উপস্থাপিত সরকারের ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৭টি উড়োজাহাজের বহর গঠনের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
কেনাকাটার পর পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন
বিমান বহর বাড়ানোর উদ্যোগকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে নতুন উড়োজাহাজগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিয়ে। এত বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজ কেনার আগে কোন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে, কোন বাজারে যাত্রী চাহিদা বেশি, প্রত্যাশিত আয় কত এবং বিনিয়োগের অর্থ কীভাবে ফেরত আসবে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু এখন পর্যন্ত বিমান এমন কোনো পূর্ণাঙ্গ বাজার বিশ্লেষণ বা নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি, যেখানে নতুন উড়োজাহাজগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার ও আয়-ব্যয়ের কাঠামো স্পষ্ট করা হয়েছে।
বোয়িং-এয়ারবাস নিয়ে ভিন্নমুখী সিদ্ধান্ত
বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। আগে ১০টি এয়ারবাস কেনার পরিকল্পনা করেছিল বিমান। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বোয়িংয়ের সঙ্গে বড় ধরনের ক্রয়চুক্তির দিকে অগ্রসর হয় সংস্থাটি।
বিমান খাতের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য শুল্কঝুঁকিও এই সিদ্ধান্তের আলোচনায় ভূমিকা রেখেছে। তবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এ ধরনের বাহ্যিক চাপের কথা অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাট গত মে মাসে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ শুল্কের বিষয়টি সামনে রেখেই বোয়িং নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
এদিকে ইউরোপীয় পক্ষ থেকেও এয়ারবাস কেনার বিষয়ে বাংলাদেশের আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ এসেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট এয়ারবাসের ঝুলে থাকা চুক্তিকে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফলে একই সময়ে বোয়িং ও এয়ারবাস দুই নির্মাতার কাছ থেকে বড়সংখ্যক উড়োজাহাজ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পরিচালনগত ও আর্থিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পাইলট সংকটের মধ্যেই বাড়ছে বহর
বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনার সময় বিমানের বিদ্যমান জনবল পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে সংস্থাটিতে প্রয়োজনের তুলনায় ৬১ জন পাইলট কম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে জানা গেছে। অর্থাৎ ককপিট ক্রুতে ঘাটতি প্রায় ২৮ শতাংশ।
এ ধরনের ঘাটতি থাকলে নতুন উড়োজাহাজ হাতে পাওয়ার পর সেগুলো নিয়মিত পরিচালনা করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী এবং গ্রাউন্ড স্টাফ প্রস্তুত করাও জরুরি।
বর্তমান বহরও পুরোপুরি কাজে লাগছে না
বিমানের বর্তমান উড়োজাহাজ ব্যবহারের পরিসংখ্যানও নতুন বহর সম্প্রসারণের আগে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, বিমানের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর উড়োজাহাজগুলো দিনে গড়ে ১৪ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা উড্ডয়ন করেছে। বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারের গড় ব্যবহার ছিল ১১ দশমিক ১৮ ঘণ্টা। আর ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজগুলো দিনে গড়ে ৮ দশমিক ৫২ ঘণ্টা পরিচালিত হয়েছে।
বোয়িং ৭৮৭-৯-এর গড় পরিচালন সময় ছিল ১৩ দশমিক ৪৮ ঘণ্টা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান উড়োজাহাজের ব্যবহার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ থাকলে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার আগে সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
দেনার চাপও কম নয়
বহর সম্প্রসারণের সময় বিমানের আর্থিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি ১১ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা রাজস্বের বিপরীতে ৭৮৫ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা দেখিয়েছে।
তবে একই সময়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিমানের বকেয়া রয়েছে ৭ হাজার ৭৫ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ৫ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা এবং পদ্মা অয়েল কোম্পানির কাছে প্রায় ১ হাজার ২৩২ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন উড়োজাহাজ কেনার অর্থায়ন কীভাবে হবে, তার বিস্তারিত শর্তও এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সেই ঋণের কিস্তি ও পরিচালন ব্যয় কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
বড় বহর, কিন্তু গন্তব্যের পরিকল্পনা কতটা প্রস্তুত?
বিমান বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর সঙ্গে ২৫টি বোয়িং, সম্ভাব্য ১০টি এয়ারবাস এবং লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা যুক্ত হলে আগামী কয়েক বছরে বহরের আকার দ্রুত বাড়বে।
কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক উড়োজাহাজের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক রুট এবং যাত্রী চাহিদা নিশ্চিত করা যাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একটি নতুন উড়োজাহাজ শুধু সম্পদ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, ক্রু, বিমা, পার্কিং এবং অন্যান্য স্থায়ী ব্যয়। পর্যাপ্ত সময় আকাশে না উড়লে সেই উড়োজাহাজ থেকে প্রত্যাশিত আয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজারে সুযোগ রয়েছে
অন্যদিকে বাংলাদেশের এভিয়েশন বাজারে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহনের বড় অংশ বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন—আইএটিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক দশকে ঢাকার বার্ষিক যাত্রী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে শুধু উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামনে মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে বিমানের মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫৪-তে পৌঁছাবে। এই বিশাল বহর পরিচালনার জন্য এখন থেকেই জনবল, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাউন্ড অপারেশন, পার্কিং, রুট এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ বিমানের সামনে এখন শুধু উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি নয়; বরং কেনা উড়োজাহাজগুলো কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, কোন রুটে চালানো হবে এবং সেখান থেকে কতটা আয় তৈরি হবে—এসব প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।







