নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান মূল্যস্ফীতিকে এমন একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে একটি সমাজের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শুধু পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; মানুষের আয়, সঞ্চয়, জীবনযাত্রার মান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও অনেক পরিবারের আয় সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবারকে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিও মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের একটি বড় দিক হলো পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া। একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হওয়ায় জীবনযাত্রার মানের ওপর চাপ তৈরি হয়। খাদ্য ও পুষ্টিতে ব্যয় কমলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। একইভাবে শিক্ষায় ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুযোগ সীমিত করতে পারে। আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধান বাড়তে থাকলে সমাজে বৈষম্যও আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার বিষয়ও জড়িত।
অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে এমন একাধিক উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৪৫ সালের ব্রিটিশ সাধারণ নির্বাচন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের নেতৃত্ব দেওয়া উইনস্টন চার্চিল সেই নির্বাচনে পরাজিত হন। যুদ্ধকালীন সময়ে তার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে থাকলেও নির্বাচনের পর লেবার পার্টির নেতা ক্লেমেন্ট অ্যাটলি সরকার গঠন করেন।
চার্চিলের পরাজয়ের কারণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণ হয়েছে। এর মধ্যে অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বেভারিজের প্রস্তাবিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি বেভারিজ রিপোর্টে নাগরিকদের জন্য একটি বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
বেভারিজ রিপোর্টে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা
উইলিয়াম বেভারিজের প্রতিবেদনে সমাজের পাঁচটি বড় সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল—রোগব্যাধি, অভাব, অজ্ঞতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বেকারত্ব। এসব সমস্যা মোকাবিলায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার একটি বিস্তৃত কাঠামোর ধারণা তুলে ধরা হয়।
১৯৪২ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন ব্রিটেনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যুদ্ধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সংকট ও ত্যাগের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৫ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি বেভারিজ রিপোর্টের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে চার্চিল যুদ্ধ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রচারণায় দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভোটারদের সমর্থন চেয়েছিলেন। নির্বাচনের পর লেবার পার্টি সরকার গঠন করে এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেয়।
পরবর্তী সময়ে বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, পারিবারিক ভাতা এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য অর্থায়নের মতো বিভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্যে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা NHS চালু হয়।
বাংলাদেশের জন্য বেভারিজের শিক্ষা
বাংলাদেশেও সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনা নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেভারিজের সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উইলিয়াম বেভারিজ ১৮৭৯ সালের ৫ মার্চ রংপুরে জন্মগ্রহণ করেন। রংপুর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা এবং এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পৈতৃক জেলা বগুড়ার কাছাকাছি।
তারেক রহমান দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে বসবাস করেছেন। যুক্তরাজ্যের সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে তার পরিচিতির বিষয়টিও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি কার্যকর কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রাজস্ব কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তার আওতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন।
সংবিধানেও রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানেও জনগণের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার রাখা হয়েছে।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মান উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং বেকারত্ব, অসুস্থতা, অক্ষমতা, বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা ও বার্ধক্যের মতো পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি সামাজিক নিরাপত্তাভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি বড় চ্যালেঞ্জ
স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশ অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। আয় বৃদ্ধির তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবার, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং সীমিত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হয়।
একটি কার্যকর কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাই সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা স্থিতিশীল না থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাবে কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একদিকে রয়েছে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক অঙ্গীকার, অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো শক্তিশালী করাই আগামী দিনের অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।






