চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই সিগারেট খাত থেকে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এ খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নিম্নস্তরের সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ শলাকার নিম্নস্তরের সিগারেটের একটি প্যাকেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হলেও বৃহস্পতিবার তা সরকারের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
দেশে সিগারেট বিক্রির বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় একটি অংশ আসে কর থেকে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া সিগারেটের মোট মূল্যের প্রায় ৮৩ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
এর আগে ১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিম্নস্তরের সিগারেটের এমআরপি বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, কাগজে-কলমে এমআরপি বাড়ানো হলেও খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপবে না।
তবে এ যুক্তি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ৬২ টাকা এমআরপি থাকার পরও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নস্তরের সিগারেট এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে ১০ শলাকার একটি প্যাকেটের দাম ৭০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে প্রতি বছর ৭৭ থেকে ৮৫ বিলিয়ন শলাকা সিগারেট বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে নিম্নস্তরের সিগারেটের অংশ ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৬৪ শতাংশ।
এনবিআর বলছে, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি সিগারেটের মূল্য ও করহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছিল। এর পরবর্তী সময়ে সিগারেটের মোট বিক্রির পরিমাণ কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে সিগারেট বিক্রি নেমে আসে প্রায় ৬২ বিলিয়ন শলাকায়। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরের ব্যবধানে মোট বিক্রি প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। রাজস্ব বোর্ডের পর্যালোচনায় নিম্নস্তরের সিগারেটের বিক্রি কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সিগারেট খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় নিম্নস্তরের সিগারেটের এমআরপি কিছুটা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের যুক্তি হলো, খুচরা পর্যায়ে ভোক্তার ক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সুযোগ থাকলেও সিগারেটের ঘোষিত এমআরপি বাড়ানো হলে রাজস্ব আদায়ের কাঠামোয় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নতুন এমআরপি নির্ধারণের পর ভোক্তা পর্যায়ে প্রকৃতপক্ষে দাম বাড়বে কি না, তা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের একজন জানান, সরকারি আদেশ পাওয়ার পর তামাক কোম্পানিগুলো নতুন মূল্য কাঠামো পর্যালোচনা করছে। তাদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত বাজারে ভোক্তাদের পরিশোধ করতে হওয়া দাম বাড়তে পারে।
এদিকে সরকার নির্ধারিত এমআরপি এবং বাজারে প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকায় নতুন সিদ্ধান্তের প্রভাব খুচরা পর্যায়ে কীভাবে পড়বে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।






