চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ট্রাস্ট পরিচালনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের সাবেক ব্যবস্থাপনা ও বর্তমান দায়িত্বশীল কয়েকজন ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, অতিরিক্ত দামে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, নগদ আদায়ের অর্থ ব্যাংকে জমা না দেওয়া, স্বজনপ্রীতি এবং ট্রাস্টের অর্থ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের সচিত্র প্রতিবেদন ফাঁস হয়েছে।
এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি ও প্রাপ্ত নথিপত্র ঘেটে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যুর পর একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ট্রাস্ট দলিলের বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ট্রাস্টি ও ট্রেজারার পদে নিয়োগের নথি তৈরি করে। পরবর্তীতে হাসপাতালের ব্যাংক হিসাবের অনুমোদিত সিগনেটরি পরিবর্তন করে আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে আইনগত বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগে ডা. রাজীব হোসেন, রিয়াজ হোসেন, মো. জাহাঙ্গীর আলম খান, ডা. কিউ এম অহিদুল আলম, রেজওয়ান শাহেদী, গোলাম ফারুক, কবির হোসেন, রুকনুজ্জামান, জনাব রাশেদ, ডা. মনিরুজ্জামান ওসমানী এবং নাসিমুল গনিসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসপাতালের দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে নগদে সংগৃহীত বিপুল অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একপর্যায়ে ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা নগদে আদায় হলেও এর মধ্যে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা হয়নি। এসব অর্থের হিসাব, ক্যাশ রেজিস্টার, ব্যাংক লেজার ও দৈনিক কালেকশন স্টেটমেন্ট পর্যালোচনার দাবীও জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. রাজীব হোসেন ও রিয়াজ হোসেনের আয়কর নথির কথাও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডা. রাজীব হোসেন মোট আয় দেখিয়েছেন ৪১ লাখ ৬০ হাজার ৬৭০ টাকা; কিন্তু অর্থবছর শেষে নগদ তহবিল দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৪৩ হাজার ৪৭৪ টাকা। একইভাবে রিয়াজ হোসেনের মোট আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৩৪৬ টাকা এবং নগদ তহবিল দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৮ লাখ ৬৭ হাজার ৮০৪ টাকা। আয় ও নগদ সম্পদের এই পার্থক্যের উৎস কী- তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘শান গ্লোবাল’ নামের একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রকৃত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দামে কেনাকাটা দেখিয়ে অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এমনকি অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এ দাবির সত্যতা নির্ধারণে এলসি, আমদানি নথি, ইনভয়েস, বিল অব এন্ট্রি, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন তথ্য যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের পরিমাণ তাদের ঘোষিত আয় ও চাকরির আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে চাকরির আয়ের তুলনায় অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে ডা. রাজীব হোসেনের নামে-বেনামে বিপুলসংখ্যক ফ্ল্যাট থাকার দাবিও করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ভূমি রেজিস্ট্রি, রাজউক/সিডিএ সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
হাসপাতালের কেনাকাটা ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি ব্যয় দেখিয়ে বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই তহবিল পুনর্বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে হাসপাতালের মূল বাজেট, অনুমোদনপত্র, ওয়ার্ক অর্ডার, কাজের পরিমাপ, বিল-ভাউচার ও পেমেন্ট রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রিন্টিং কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘লাবিব প্রিন্টিং প্রেস’-এর নামে হাসপাতালের বিভিন্ন প্রিন্টিং কাজ দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হাসপাতালের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা ডা. রবিউল হোসেনের আত্মীয় হওয়ায় নিয়ম না মেনে কাজ দেওয়া এবং অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
২০০৮ সালের একটি পুরোনো আর্থিক অনিয়মের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সে সময় ম্যানুয়াল কালেকশন বইয়ের কার্বন কপি ব্যবহার করে রোগীদের কাছ থেকে সংগৃহীত ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক অডিট ও তিনটি তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে তিন ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়েছিল বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। তবে ওই অর্থ পরবর্তীতে উদ্ধার হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি যাচাইয়ে পুরোনো অডিট রিপোর্ট, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অর্থ আদায়ের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবসর-পরবর্তী নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, অ্যাকাউন্টস বিভাগের কর্মকর্তা সাবের নিজামীকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসর দেখানোর পরদিন, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই কোনো বিরতি ছাড়াই একই পদে বহাল রাখা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী অবসরের পর নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান ও আবেদনের ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি কর্মঘণ্টায় ওই কর্মকর্তাকে হাসপাতালের পরিবর্তে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত কাজ করতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়োগ নথ







