চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ বেশ এগিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বন্দর ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায়।
এনসিটি পরিচালনার পাশাপাশি এর পাশের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে দুটি টার্মিনালকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রস্তাবও দিয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে এ প্রস্তাবকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ সভায় এনসিটি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবসহ টার্মিনাল পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত এনসিটির মূল অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হয় ৭৩৭ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে টার্মিনালের ব্যাকআপ সুবিধা, কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটিতে সরকারের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
বিপুল সরকারি অর্থে নির্মিত ও বর্তমানে কার্যক্রম চালানো এই টার্মিনালকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকে।
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, তাঁর দায়িত্বকালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল।
তখন প্রতিষ্ঠানটিকে অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। এ মডেলে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল পরিচালনা করে নির্ধারিত সেবা ফি পেত এবং মূল রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকত।
পরবর্তীতে চুক্তির কাঠামোয় পরিবর্তন এনে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কনসেশনিয়ার হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব আসে বলে জানান মোহাম্মদ শাহজাহান।
কনসেশন মডেলে টার্মিনাল ব্যবহারের বিপরীতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ প্রথমে কনসেশনিয়ারের হিসাবে জমা হতে পারে। পরে চুক্তিতে নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী সেই আয়ের একটি অংশ বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে।
মোহাম্মদ শাহজাহানের আশঙ্কা, এ ধরনের কাঠামো কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদে চট্টগ্রাম বন্দর আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ কনটেইনার ওঠানামা ছাড়াও স্টোরেজ, বিভিন্ন সেবা ও অন্যান্য কার্যক্রম থেকে টার্মিনালের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত আর্থিক কাঠামো নিয়েও সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন কমিটির মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ ফুটের একটি কনটেইনার থেকে গড় আয় কত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে রয়্যালটির পরিমাণ নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে গড় আয় ১০৫ ডলারের কম হলে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে ৪২ দশমিক ৫০ ডলার এবং গড় আয় ২১০ ডলার বা তার বেশি হলে ১৪১ দশমিক ৫০ ডলার রয়্যালটি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ বিভিন্ন ট্যারিফ স্ল্যাবের ভিত্তিতে রেভিনিউ শেয়ারিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, লালদিয়া ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের মতো অন্যান্য পিপিপি প্রকল্পে প্রতি টিইইউ কনটেইনারের বিপরীতে নির্দিষ্ট রাজস্ব কাঠামো বিবেচনা করা হয়েছে। অনুমোদিত আরএফপিতেও প্রতি টিইইউ নির্দিষ্ট রাজস্বের শর্ত রাখা হয়েছে। তাহলে এনসিটির ক্ষেত্রে পরিবর্তনশীল রাজস্ব ভাগাভাগির পদ্ধতি কেন প্রস্তাব করা হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্ট আর্থিক মডেল অনুযায়ী, প্রতি টিইইউ কনটেইনারে পরিবর্তনশীল পরিচালন ব্যয় ১৬ দশমিক ৩৯ ডলার। এর বাইরে স্থায়ী প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় রয়েছে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার, যা টার্মিনাল পরিচালনার ক্ষেত্রেও বন্দর কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।
অন্যদিকে প্রতি টিইইউ কনটেইনারে এনসিটির গড় গ্রস আয় প্রায় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে কনটেইনার স্টোরেজ বা স্টোর রেন্ট থেকে। এ খাতে প্রতি টিইইউতে প্রায় ৪০ ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নে বলা হয়েছে, স্টোর রেন্টসহ বর্তমান রাজস্বের একটি অংশ বাদ পড়লে কার্যকর আয় প্রতি টিইইউতে প্রায় ১২০ ডলারে নেমে আসতে পারে।
এই হিসাবে প্রতি ২০ ফুট কনটেইনারে গ্রস আয় ১২০ ডলার হলে প্রস্তাবিত কাঠামোয় বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ দাঁড়াবে ৫৮ দশমিক ৫০ ডলার। এর মধ্যে ৪১ দশমিক ৩২ ডলার পরিচালন ব্যয় হিসেবে ব্যয় হলে বন্দরের নিট মার্জিন থাকবে মাত্র ১৭ দশমিক ১৮ ডলার।
অথচ বর্তমান আর্থিক কাঠামো অনুযায়ী একই পরিমাণ আয় থেকে পরিচালন ও পরিবর্তনশীল ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বন্দরের মার্জিন প্রায় ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার বলে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে জানা গেছে।
এনসিটি নিয়ে বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টার্মিনালে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বর্তমান অবস্থা।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে আয়তনের দিক থেকে এনসিটি দ্বিতীয় হলেও কার্যক্রমের দক্ষতার দিক থেকে এটি এগিয়ে রয়েছে।
জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) ছয়টি, এনসিটিতে চারটি, সিসিটিতে দুটি এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) তিনটি জেটি রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয় জেটির জিসিবিতে ৪৬৫টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়। বিপরীতে চার জেটির এনসিটিতে জাহাজ এসেছে ৭৮১টি। একই সময়ে সিসিটিতে ২৩৮টি এবং পিসিটিতে ১২২টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়েছে।
গেল অর্থবছরে এনসিটি একাই প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। অথচ কাগজে-কলমে টার্মিনালটির বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১১ লাখ টিইইউ।
২০১৭ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিটি অর্থবছরেই এনসিটি নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত পিপিপি প্ল্যাটফর্মের একটি বৈঠকেও এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
ওই বৈঠকে পিপিপি অফিসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন মুখ্য সচিব এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বিষয়টি মিটিং নোটসেও অন্তর্ভুক্ত করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
এনসিটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের অন্য টার্মিনালগুলোও বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। এতে সহযোগী হিসেবে রয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক। সিসিটি পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ারটেক এবং পিসিটির দায়িত্বে রয়েছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে এনসিটির সক্ষমতা ও কার্যদক্ষতা বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির আহ্বায়ক জাহিদুল করিম কচি ও সদস্য সচিব ডা. খুরশীদ জামিল চৌধুরী বলেন, এনসিটির মূল অবকাঠামো নির্মাণে ৭৩৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরবর্তীতে ব্যাকআপ সুবিধা এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
তাদের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এনসিটিতে সরকারি বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। তাই একটি সচল ও লাভজনক রাষ্ট্রীয় সম্পদ অন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় যাচাই ও পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে ফারহান লজিস্টিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা সম্প্রতি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ফলে এ বিষয়ে এখনই বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারছেন না। পরে বিস্তারিত জানাবেন বলেও জানান তিনি।
এনসিটি নিয়ে বিতর্ক এখন শুধু টার্মিনালটি কে পরিচালনা করবে, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ, ভবিষ্যৎ যন্ত্রপাতি কেনার ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, স্টোরেজ রেন্ট থেকে আয় এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্বের হিসাব।
সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে বন্দরসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, এনসিটিতে ইতোমধ্যে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিও রয়েছে।
তাই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে প্রস্তাবিত ২০৫ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কোন কোন খাতে হবে, কনসেশনের মেয়াদ কত হবে, রাজস্ব ভাগাভাগির সূত্র কী থাকবে, স্টোরেজ রেন্টের আয় কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং পরিচালন ব্যয়ের দায় কে নেবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এসব বিষয় স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা না হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেটিই এখন এনসিটি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।






