নেপালের ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা বহন করে। কেননা বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত না হলেও দেশের বড় একটি অংশ হিমালয় ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নদী অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকার সঙ্গে এদেশের নদী ও জনজীবনের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক।
হিমালয়ঘেরা নেপালে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশটিতে প্রায়ই দুর্যোগ দেখা দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল—পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্যোগ এখন আর একক কোনো প্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি বিপর্যয় আরেকটি বিপর্যয়কে উসকে দিয়ে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে। গবেষকদের ভাষায়, এটি ‘ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড’ বা ধারাবাহিক দুর্যোগের একটি ভয়াবহ উদাহরণ। আর ধীরে ধীরে তা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সাধারণভাবে বন্যা বলতে আমরা অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বেড়ে যাওয়াকে বুঝি। কিন্তু হিমালয়ের মতো ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চলে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে হিমবাহ ধস, বরফ-শিলার ধস, ভূমিধস, নদীর প্রবাহে সাময়িক বাধা। আর সেই বাধা ভেঙে আকস্মিক জলপ্রবাহ। ফলে শুরুতে যে ঘটনাটি ছোট মনে হয়, সেটিই অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হতে পারে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষেত্রেও এমন ধারাবাহিকতার প্রমাণ মিলেছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলে ধারণা করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, একটি বিশাল বরফ-শিলা ধস ভোতেকোশি নদীর ওপর নেমে আসে। এতে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও মাটি একসঙ্গে নিচের দিকে ধেয়ে যায়। প্রবাহের পথে তৈরি হওয়া বাধা ভেঙে গেলে তা আরো শক্তিশালী স্রোতে পরিণত হয়। অর্থাৎ এখানে কেবল ‘বন্যা’ হয়নি। বরং হিমবাহ ধস, ধসের ধ্বংসাবশেষ, নদীর প্রবাহে বাধা, আকস্মিক বাধ ভেঙে যাওয়া, বন্যা, ভূমিধস ও অবকাঠামো ধ্বংস—এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ি অঞ্চলে নদীগুলো সাধারণত সরু উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এলে সেগুলোর ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কম থাকে। সংকীর্ণ উপত্যকা দিয়ে পানি দ্রুতগতিতে নিচের দিকে ধেয়ে যায়। সঙ্গে থাকে বিশাল পাথর, গাছ, মাটি ও বরফ। এতে একটি সাধারণ বন্যা মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হতে পারে ধ্বংসাত্মক স্রোতে।

এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আগাম সতর্কতার সময় খুব কম। ভারী বৃষ্টির ক্ষেত্রে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে অনেক সময় মানুষকে সরিয়ে নেয়া সম্ভব। কিন্তু কোনো পাহাড় বা হিমবাহের বড় অংশ হঠাৎ ধসে পড়লে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে কয়েক মিনিটের মধ্যে। এ কারণেই এ ধরনের ‘ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড’ শনাক্ত ও মোকাবিলা করা প্রচলিত বন্যা ব্যবস্থাপনার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
আর এ পরিবর্তিত ঝুঁকির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা হিমালয়ের হিমবাহগুলোকে দ্রুত গলিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বরফ ও পারমাফ্রস্টের স্থিতিশীলতা কমে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে আগে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকা কিছু ভূ-প্রকৃতি এখন ধস ও ভাঙনের জন্য বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক নেপাল দুর্যোগের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা উষ্ণায়ন, হিমবাহের পরিবর্তন ও পাহাড়ের অস্থিতিশীলতার সম্পর্কের দিকে নজর দিচ্ছেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তন সব দুর্যোগের সরাসরি কারণ নয়। কিন্তু এটি এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে একাধিক বিপজ্জনক প্রক্রিয়া একই সময়ে সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফলে ঝুঁকির চরিত্রও বদলে যায়।
নেপালের ঘটনা বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা বহন করে। কেননা বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত না হলেও দেশের বড় একটি অংশ হিমালয় ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নদী অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা ও মেঘনা অববাহিকার সঙ্গে এদেশের নদী ও জনজীবনের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক।
উজানে পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি, ভূমিধস, হিমবাহ-সংক্রান্ত আকস্মিক বন্যা কিংবা নদীর গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে নিচের দিকে আসতে পারে। নেপালের মতো বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায়ও ভারী বৃষ্টি ও ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে বর্ষাকালে ভূমিধস ও আকস্মিক জলপ্রবাহের ঘটনা এরই বাস্তব উদাহরণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরো একটি বড় ঝুঁকি হলো নদী অববাহিকার আন্তঃসীমান্ত প্রকৃতি। কোনো দুর্যোগের উৎস বাংলাদেশের বাইরে হলেও তার পানি ও পলি শেষ পর্যন্ত দেশের নদীতে এসে পৌঁছতে পারে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শুধু জাতীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয় তা হলো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু ‘বন্যা আসছে’—এমন সতর্কবার্তা যথেষ্ট নয়। এখন জানতে হবে কেন বন্যা হচ্ছে এবং এরপর কী ঘটতে পারে। যদি পাহাড়ধস নদী আটকে দেয়, তাহলে সেই স্থানটি নজরদারিতে আনতে হবে। নদীতে সাময়িক বাঁধ তৈরি হলে তা ভেঙে আকস্মিক বন্যা হতে পারে, এ সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে। একইভাবে কোনো হিমবাহ বা হিমবাহ-হ্রদে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক করতে হবে নিচের জনপদগুলোকেও। অর্থাৎ ভবিষ্যতের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দরকার একটি সমন্বিত ঝুঁকি-মানচিত্র, যেখানে বন্যা, ভূমিধস, হিমবাহ, নদী, অবকাঠামো ও জনবসতিকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হবে।

নেপালের ভয়াবহ বন্যা আমাদের আরো মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে দুর্যোগের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। আগে একটি দুর্যোগকে একটি নির্দিষ্ট ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এখন একটি ঘটনা অন্য ঘটনাকে জন্ম দিতে পারে। পাহাড়ধস থেকে নদী আটকে যেতে পারে, নদী আটকে গিয়ে হঠাৎ বন্যা হতে পারে, সেই বন্যা সেতু-সড়ক ধ্বংস করে উদ্ধার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে; এভাবে একটি বিপর্যয় একাধিক বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও হতে হবে সমন্বিত। উন্নত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, পাহাড় ও হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিতকরণ, নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সীমান্তপারের তথ্য বিনিময়কে গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্যোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সময় শেষ। একটি দুর্যোগের পর আরেকটি দুর্যোগ আসতে পারে—এ বাস্তবতাকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই ভয়াবহ স্মারক।







