চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা নাছিরের বিরুদ্ধে চাকরির আড়ালে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২২ বছরের চাকরিজীবনে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ও জীবনযাপনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের সঙ্গে বৈধ আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর বিভিন্ন সময়ে ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নাছির বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর নামে-বেনামে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, ব্যাংকে অর্থ এবং একাধিক গাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, পটিয়া উপজেলার কুলগাঁও ইউনিয়নের কালারপুর এলাকার দিনমজুর নুর মোহাম্মদের ছেলে নাছির। ২০০৪ সালে জোট সরকারের আমলে ভূমি অফিসে তার চাকরি হয়। ভূমি অফিসে চাকরি মানে তার যেন কোটি টাকার লটারি পাওয়া। ২২ বছরের চাকুরিজীবনে তার বৈধ আয় ৭০ লাখ থেকে ৮০ লাখের বেশি নয়। অথচ তার নিজ বাড়ি পটিয়ায় রয়েছে ৫ হাজার বর্গফুটের আলিশান বাড়ি।
এছাড়াও তার নামে নগরের কোতোয়ালী থানার ইয়াকুবনগর আবাসিক এলাকায় এপিক প্রপার্টিজের প্রায় ২ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
এছাড়াও কুলগাঁওয়ে চাপরা মৌজায় নামে-বেনামে ১০ একরের বেশি জমি, নগরীর পাথরঘাটা এলাকায় দুই কাঠা প্লট স্ত্রী-সন্তানদের জন্য ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখা এবং ব্যক্তিগত ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য কোটি টাকা দামের দুটি গাড়ি। সরকারি চাকুরীজীবিদের সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহারপূর্বক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হতে অনাপত্তিপত্র নিয়ে বহির্গমন কথা থাকলেও সে ব্যক্তিগত পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাই/ সৌদিআরব /ভারত /সিঙ্গাপুর বিভিন্ন দেশে স্বপরিবার নিয়ে ভ্রমন করেন।
নাছিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ উত্তোলনে অনিয়ম। ২০১৩ সালের পতেঙ্গা রিং রোড প্রকল্পে দক্ষিণ হালিশহর মৌজার ভূমি অধিগ্রহণের টাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে ভুয়া খাজনার রশিদ তৈরি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় নাছিরের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ-সংক্রান্ত দুটি কথিত জাল দাখিলার তথ্যও রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে পতেঙ্গা ভূমি অফিস থেকে বদলি হওয়ার পরও তিনি আবারও মধুর খোঁজে চলেন আসেন। পরবর্তীতে আবারও ভূমি অফিসের দায়িত্বে আসার পর একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে পতেঙ্গা-হালিশহর বে-টার্মিনাল প্রকল্পের এলএ শাখা থেকেও ৫ কোটি টাকা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের উৎস বের করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে তা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের আরও দাবি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিত যাচাই করা হলে এ ধরনের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘‘রাষ্ট্রে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ। আইনের প্রয়োগ দুর্বল হলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যায়। সমাজে সৎ কাজের মূল্যায়ন কমে গিয়ে যখন অর্থের কদর বাড়ে তখন দুর্নীতিবাজরা অবৈধ সম্পদকে সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে দেখতে চায়’’
তিনি বলেন, সমাজে যখন কাজের মূল্যায়নের চেয়ে অবৈধ অর্থ ও সম্পদকে মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়, তখন দুর্নীতি ও ঘুষের প্রবণতা আরও বাড়ে। এতে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়।







