ঠাকুরগাঁওয়ের একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম। কৈশোরে সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে উত্তাল রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, এরপর শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি—সবশেষে সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ। দীর্ঘ কয়েক দশকের পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান ফখরুল।
ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন ফখরুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
ষাটের দশকের শেষ দিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নেতৃত্বের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির অন্যতম সক্রিয় কর্মী ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে গ্রেপ্তারও হতে হয়েছিল।
ছাত্রজীবনের এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক চিন্তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা গড়ে ওঠার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন ফখরুল। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্বেও কাজ করেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
এ সময় তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরপর ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় জাতীয় রাজনীতিতে তার সক্রিয়তা বাড়তে থাকে। এই সময় তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান।
স্থানীয় রাজনীতি থেকেই ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হন।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতেও তার সাংগঠনিক ভূমিকা ক্রমে বাড়তে থাকে।
২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের গুরুত্ব আরও বাড়ে। দলটির বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পর তিনি জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পান তিনি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে এই দায়িত্ব পালন করে তিনি বিএনপির অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন।
বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ে মির্জা ফখরুল দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও সংবাদ সম্মেলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার ও মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব ঘটনায় বিএনপি তাকে দলের আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সামনে রেখেছে।
তার রাজনৈতিক বক্তব্যের ধরনও তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তুলনামূলক শান্ত ও পরিমিত ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য তিনি রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মির্জা ফখরুলের পথচলায় এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব।
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন তিনি। ২০ আগস্ট ২০২৬ সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ওলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। এটি ১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।
এক সময়ের ছাত্রনেতা, যিনি অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন, সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়ে এসেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি—তার এই দীর্ঘ পথচলা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকল।






