তীব্র গরমে পুড়ছে জাপান। আর এই গরম মোকাবিলায় জাপানিরা উদ্ভাবন করেছে ‘মানব ফ্রিজ’। ‘দো হিয়েমন বক্স’ নামক এই পোর্টেবল কুলিং বুথটি জাপানে দ্রুতই হিটস্ট্রোক প্রতিরোধের এক কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। খবর ফার্স্টপোস্টের।
চলতি বছরের এপ্রিলে রেফ্রিজারেশন ও ভেন্ডিং মেশিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসডিআরএস বাণিজ্যিকভাবে এই মানব ফ্রিজ বাজারে নিয়ে আসে। বর্তমানে এটি বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহকারী পরাশক্তি ট্রাসকো নাকায়ামা কর্পোরেশন। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি এই বুথটি প্রাণঘাতী দাবদাহের সময় মানুষের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনার লক্ষ্যে তৈরি।
তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বা তার বেশি হয়, তখকার অবস্থানকে বর্ণনা করতে ‘কোকুশোবি’ শব্দটি ব্যবহার করে জাপান আবহাওয়া সংস্থা। যার আক্ষরিক অর্থ ‘নৃশংস তাপদায়ক দিন’।
জুলাইয়ের শেষের দিকে জাপানে নজিরবিহীনভাবে টানা পাঁচ দিন ‘কোকুশোবি’ পরিস্থিতি বিরাজ করে। কেবল টোকিওতেই তীব্র তাপজনিত অসুস্থতার কারণে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জরুরি সেবা সংস্থাগুলো ৪৫০ জনেরও বেশি মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করে। আর এই অসহনীয় গরমের কারণেই জাপানে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে মানব ফ্রিজ।
‘মানব ফ্রিজ’ যেভাবে কাজ করে
‘দো হিয়েমন বক্স’-এর নকশা ও শীতলীকরণ প্রযুক্তি জাপানের বহুল ব্যবহৃত হিমায়িত খাবার বিক্রির ভেন্ডিং মেশিন থেকে নেয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় ফ্রোজেন-মিল ডিসপেন্সার তৈরির জন্য পরিচিত এসডিআরএস তাদের উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ইনসুলেশন ও কুলিং মেকানিজমকে মানুষের অবস্থান উপযোগী একটি চেম্বারে রূপান্তর করেছে।
সম্পূর্ণ একটি কক্ষ ঠান্ডা করার বদলে এই বুথটি একজন ব্যক্তিকে ভেতরের ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আটকে রাখে। ব্যবহারকারী অভ্যন্তরীণ টুলে বসলেই উচ্চগতির ভেন্ট থেকে মাথা, ঘাড়, কাঁধ এবং পিঠের ওপরের অংশে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তীব্র ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করে।
রক্তপ্রবাহ থেকে দ্রুত তাপ শুষে নিয়ে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে সাহায্য করতে শরীরের এই নির্দিষ্ট অঞ্চলগুলোকে বেছে নেয়া হয়েছে। কারণ এসব স্থানে ত্বকের ঠিক নিচেই বড় রক্তনালী অবস্থান করে।
অতিরিক্ত ঠান্ডা বা আকস্মিক হাইপোথার্মিয়া প্রতিরোধে এতে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছে। ২০ মিনিট পর ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যাতে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের বাতাসে অবস্থান না করেন।
‘ফ্ল্যাশ কুলিং’ কেন এত কার্যকর
মানবদেহ মূলত ত্বকের রক্তনালীর প্রসারণ এবং ঘামের মাধ্যমে ভেতরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। চরম তাপীয় চাপে (৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে) হৃদপিণ্ড ত্বকে অতিরিক্ত রক্ত সঞ্চালন করে তাপ বের করার চেষ্টা করায় কার্ডিওভাসকুলার চাপ অনেক বেড়ে যায়।
হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তি ‘দো হিয়েমন বক্সে’ প্রবেশ করলে শরীর ঠান্ডা হতে শুরু করে। এর মাধ্যমে ঘাড়ে থাকা ক্যারোটিড ধমনী এবং মেরুদণ্ডের রক্তনালীতে ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করায় মস্তিষ্কে প্রবাহিত রক্ত দ্রুত ঠান্ডা হয়। ফলে মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা ও চরম অবসাদের মতো লক্ষণ কমে আসে।
এসডিআরএসের ক্লিনিকাল সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৫ মিনিটের সেশনে উল্লেখযোগ্য শারীরিক স্বস্তি মেলে এবং ১০ মিনিটের অবস্থান শরীর কাঁপানো ছাড়াই শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
‘মানব ফ্রিজের’ দাম কত
জাপানের এই ’ভাইরাল’ মানব ফ্রিজের দাম প্রায় ৯ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার টাকা)। আপাতত বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রাসকো নাকায়ামা ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর চেয়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চলের পরিচালক এবং সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এটি বিক্রি করছে।







