দেশের প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তন করে এপ্রিল-মার্চ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে শিগগিরই মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব তোলার প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন মিললে আগামী অর্থবছর থেকেই নতুন সময়সীমা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশে অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ এ পরিবর্তনের ফলে আইন, বাজেট প্রণয়ন, কর ব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হবে, তা খতিয়ে দেখছে।
প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে। একই সঙ্গে পুরোনো অর্থবছর শেষ করা এবং নতুন অর্থবছরে প্রবেশের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।
বর্ষাকাল এড়াতেই অর্থবছর এগিয়ে আনার চিন্তা
অর্থবছর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্ষার প্রভাব। বর্তমানে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময় বর্ষাকালের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়।
অর্থবছরের শেষদিকে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করার চাপও তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে জুনের মধ্যে বিল পরিশোধের জন্য তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হয়। এতে কাজের মান কমে যাওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগও ওঠে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে শেষ তিন মাস হবে জানুয়ারি থেকে মার্চ। এতে বর্ষাকাল অর্থবছরের শেষ প্রান্ত থেকে সরে যাবে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র, কার্যাদেশ, বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধের সময়সূচি আরও বাস্তবসম্মতভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, অর্থবছর এগিয়ে আনার উদ্যোগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। তার মতে, অর্থবছরের শেষ সময়ে বর্ষার কারণে উন্নয়নকাজ ব্যাহত হওয়া এবং জুনে বিল পরিশোধের চাপে তড়িঘড়ি কাজ করার প্রবণতা কমাতে এ পরিবর্তন ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু অর্থবছর নয়, বদলাতে হবে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা
অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে আনাকে কেবল সময়ের পরিবর্তন হিসেবে দেখছে না সরকার। এর প্রভাব পড়বে রাজস্ব আদায়, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, বাজেট প্রণয়ন, সরকারি হিসাব, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন আর্থিক সফটওয়্যারে।
সরকারি হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজেট সফটওয়্যারকে নতুন সময়সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। একই সঙ্গে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা, ক্রয় পরিকল্পনা এবং অর্থছাড়ের সময়সূচিও নতুন করে সাজাতে হবে।
চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মেয়াদ নিয়েও নতুন করে হিসাব করতে হবে। যেসব প্রকল্পের সময়সীমা জুলাই-জুন কাঠামোয় নির্ধারিত, সেগুলো কীভাবে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ঠিকাদারদের কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন
অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে সরকারি দরপত্র ও ঠিকাদারি কাজের ওপরও। বর্তমানে অনেক প্রকল্পে অর্থবছরের শেষদিকে বিল পরিশোধের চাপ দেখা যায়। এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে সেই চাপ মার্চে চলে আসবে।
ফলে কখন দরপত্র আহ্বান করা হবে, কখন কার্যাদেশ দেওয়া হবে এবং বছরের কোন সময়ে নির্মাণকাজ সবচেয়ে বেশি হবে এসব বিষয় নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। প্রকল্প পরিচালকদেরও ক্রয় ও অর্থছাড়ের পরিকল্পনা নতুন কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ
অর্থবছর পরিবর্তনের পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতেও সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সব মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ড্যাশবোর্ডে প্রকল্পের অগ্রগতি অনুযায়ী সেগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হবে। এতে কোন প্রকল্প পিছিয়ে আছে এবং কোথায় দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা সহজে শনাক্ত করা যাবে।
পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, নির্মাণকাজের রেট শিডিউলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগেও অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ হয়েছিল
বাংলাদেশে অর্থবছর পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়। এর আগে ২০১০ সালেও জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে নানা কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়েও অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। ২০২৬ সালের বাজেট প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বরকে অর্থবছর করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অর্থবছরকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার পক্ষে মত দেন। তার যুক্তি ছিল, অর্থবছরের শেষদিকে দ্রুত অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা কমাতে সময়সীমার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তবে সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা জানুয়ারি-ডিসেম্বর নয়, এপ্রিল-মার্চকে নতুন অর্থবছর হিসেবে বিবেচনা করা।
সময় বদলালেই অপচয় বন্ধ হবে না
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তন করলেই সরকারি অর্থের অপচয় বা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। এজন্য প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ—পুরো প্রক্রিয়ায় সংস্কার প্রয়োজন।
ফাহমিদা খাতুনের মতে, অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সঙ্গে অন্যান্য ব্যবস্থাকেও ধাপে ধাপে সমন্বয় করতে হবে। তাহলে নতুন অর্থবছরের কাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু হলে বাংলাদেশের বাজেট ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে। তবে এর বাস্তবায়নের আগে পুরোনো অর্থবছরের হিসাব বন্ধ, চলমান বাজেটের সমন্বয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপান্তর এই তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।







