ইরান ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পরিচালনার বিষয়ে একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে হলেও, ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না।
আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করলেও এ খবরের ফলে আলোচনা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের মন্তব্যের পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারের বেশি হয়। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করার পর তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে গিয়েছিল।
বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ যে প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়, সেই হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
পারস্য উপসাগরকে ভারত মহাসাগর ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা এই জলপথ ইরান কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার কয়েক দিন পরই তেহরান এই পদক্ষেপ নেয়।
এখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে চাপ দিচ্ছে, যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগের মাত্রায় জাহাজ চলাচল আবার শুরু হয়। কিন্তু তেহরান এই নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে আরও কিছু ছাড় আদায়ের চেষ্টা করছে।
জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধ বন্ধ এবং শান্তি আলোচনা শুরুর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, তখন চুক্তির অস্পষ্ট ভাষার কারণে হরমুজ প্রণালির বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সেই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ওমানের সঙ্গে তারা এমন একটি বিষয়ে একমত হয়েছে যে, প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের আঞ্চলিক জলসীমা দিয়ে প্রবেশ করবে এবং বের হয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের জলসীমা ব্যবহার করবে।
এই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে জলপথটির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, ‘যেকোনো অস্থায়ী পথ কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই পরিচালিত হবে—অর্থাৎ এর জন্য কোনো অনুমোদন বা অনুমতি লাগবে না এবং কোনো টোল বা অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। কোনো পক্ষই এর চলাচলের পথ বা এর মধ্য দিয়ে যাতায়াতের অধিকার নিয়ন্ত্রণ করে না।’
প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এই মন্তব্য করেন।
রোববার ট্রাম্প তেহরানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে পরদিন তিনি জানান, কূটনীতিকে আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সোমবার ট্রাম্প বলেন, এই আলোচনা ইরানের জন্য ‘চুক্তির শেষ সুযোগ’। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তেহরানের দাবি, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এবং এটি আলাদা একটি প্রক্রিয়া।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বুধবার বলেন, আলোচনা ‘চূড়ান্ত পর্যায়ের কাছাকাছি’ পৌঁছেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরানের এখনো কিছু দাবি পূরণ হওয়ার বাকি রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সির (আইআরএনএ) বরাতে ঘারিবাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দর অবরোধ বন্ধ করতে হবে, যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞাগুলো নিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে হবে এবং লেবাননে চলমান সহিংসতার বিষয়টি সমাধান করতে হবে।
লেবাননে ইরানের সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত।
ঘারিবাবাদি বলেন, ‘এই সমঝোতার অর্থ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া নয়, বরং এটি একটি নতুন ও ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা।’
তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ‘জাহাজ চলাচলের একটি বড় অংশ’ ইরানের জলসীমা দিয়ে পরিচালিত হবে।
ঘারিবাবাদি আরও বলেন, ইরান ও ওমান ‘সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল পরিচালনার জন্য একটি যৌথ সমন্বয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা’ নিয়েও আলোচনা করেছে। এই ব্যবস্থায় দুই দেশ প্রবেশ ও প্রস্থান করতে চাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে’।
আইআরএনএ প্রকাশিত ঘারিবাবাদির বক্তব্যের সারাংশে কোনো ফি বা টোল নেওয়ার বিষয়ে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিকভাবে গঠিত কোনো প্রণালি ব্যবহারের জন্য কোনো দেশ টোল আরোপ করতে পারে না। তবে সংঘাতের আগের বিভিন্ন পর্যায়ে ইরানের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, তারা এই পথ ব্যবহারের জন্য সেবা ফি নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
বুধবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওমানের সঙ্গে আলোচনায় ইরান জাহাজের পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি নেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
যদি যুদ্ধের আগের মাত্রায় জাহাজ চলাচল ফিরে আসে, তাহলে এই ধরনের ব্যবস্থা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার আয় হতে পারে। ইউরেশিয়া গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রিউয়ের হিসাব অনুযায়ী, প্রথম বছরেই এই আয় প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তবে ব্রিউ উল্লেখ করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পথ দিয়ে চলাচল কমে যেতে পারে। কারণ আরও বেশি দেশ এমন পাইপলাইন ও অবকাঠামো তৈরি করছে, যার মাধ্যমে তারা হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহন করতে পারবে।
তেহরান ও ওয়াশিংটন—দুই পক্ষই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চাপের মধ্যে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা ইরানের বন্দর অবরোধ দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইরানে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকট বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি যত বেশি সময় বন্ধ থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি তত বাড়বে।
সর্বশেষ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের বেশি হয়ে গিয়েছিল।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাজারে সরবরাহ সংকট মোকাবিলার সুযোগ কমে গেলে ভবিষ্যতে তেলের দাম আরও বড় ধরনের বৃদ্ধি পেতে পারে।







