একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোর মালিকানায় পুরনো মালিকদের ফেরত আসার সুযোগ রেখে ‘ব্যাংক রেজোলিউশন আইন, ২০২৬’-এ যুক্ত করা ১৮(ক) ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান।
বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে সরকার এই ১৮(ক) ধারাটি বিলোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে একীভূত হওয়া কোনো দুর্বল ব্যাংকের পূর্বতন মালিকরা পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ পাবেন না।
ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বার্তা স্পষ্ট—যারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, আমানতকারীদের আমানতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।’
এর আগে, অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণীত ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন অর্ডিনেন্স’ সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমানে পুনর্গঠিত সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোর ওপর সাবেক মালিকদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় ফিরে পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছিল।
সংশোধনীটি বিশেষভাবে পাঁচটি সংকটাপন্ন ব্যাংকের চলমান একীভূতকরণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক—যেগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের অংশ হিসেবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত করা হচ্ছিল।
সংসদে পাস হওয়া ঐ নতুন বিধানে ব্যাংকগুলোর সাবেক মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করে তাদের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনরায় অধিগ্রহণ করতে পারবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সংকটাপন্ন পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে চারটি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে।
১৮ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি সংশোধন করেছে সরকার। এই ধারায় বলা হয়েছে, রেজ্যুলেশনের তালিকাভুক্ত কোনো ব্যাংকের আগের মালিকরা ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় পুনঃঅধিগ্রহণের জন্য রেজ্যুলেশন কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।
মালিকানা ফিরে পাওয়ার শর্ত হিসেবে বলা হয়, পুরনো মালিকদের আবেদনের সঙ্গে আলাদা একটি অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। এতে উল্লেখ করতে হবে যে, তারা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সব অর্থ পরিশোধ করবে, নতুন মূলধন যোগান দেবে এবং বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
এছাড়া তারা আগের সব আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ করবে, সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ করবে, ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ দেবে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন করবে।
আবেদন মঞ্জুরের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে সরকারের অনুমোদন নেবে। আবেদন চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের তিন মাসের মধ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত অর্থের অন্তত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ পে-অর্ডার দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
অনুমতি দেওয়ার পর দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে। এরপর একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে শর্ত পালনের বিষয়টি তদন্ত করা হবে। ব্যর্থতা ধরা পড়লে অনুমতি বাতিলের সুপারিশ করা যাবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই উদ্যোগকে ‘ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার’ দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে একে ‘মার্কেট সলিউশন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জাতীয় সংসদে বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে দুর্বল ব্যাংক খাতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং সামনে আরও প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় আর্থিক চাপ দীর্ঘমেয়াদে সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন।’
তার ভাষায়, নতুন ব্যবস্থায় আবেদনকারীদেরই মূলধন পুনঃস্থাপন, দায় পরিশোধ এবং আগে দেওয়া সহায়তা ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। ফলে সরকার বা আমানত সুরক্ষা তহবিলের ওপর চাপ কমবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এর মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনর্গঠন করে দ্রুত কার্যক্রম চালু করা গেলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মালিকানা পুনর্বহালের সুযোগ দিলে নির্দোষ সাধারণ শেয়ারধারীদের আর্থিক স্বার্থ পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হবে। এটি ন্যায্যতা, সাম্যতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।’







